রবির মাংপবী-৫

৫ শারদীয়া আনন্দবাজারে গল্প শেখার সাম্মানিক একশো টাকা মংপুতে বসে তিনি কবিতা, চিঠি অনেকই লিখেছেন। প্রসঙ্গক্রমে সেগুলোর কিছু কিছু উল্লেখও করেছি। তবে এই পরিচ্ছেদে সেই লেখাগুলির কথা না বলে মংপুতে বসে তাঁর দুটি গল্প লেখার কথা বলতে চাইছি। প্রথম গল্পটি ‘রবিবার’। এই গল্পটি মংপুতে বসে লিখেছিলেন কিনা, সে বিষয়ে কোথাও প্রামাণ্য কিছু লেখা নেই। ‘গল্পগুচ্ছ’ গল্প-সংকলনে যেভাবে সময়ানুসারে গল্পগুলিকে সাজানো হয়েছে, তাতে দেখা যাচ্ছে, ‘রবিবার’-এর আগে তিনি শেষ ছোট গল্প লিখেছেন ছ’বছর আগে। গল্পের নাম ‘চোরাই ধন’ যার প্রকাশকাল কার্তিক ১৩৪০। ‘রবিবার’ প্রকাশিত হয়েছে আশ্বিন ১৩৪৬। অর্থাৎ ১৯৩৯ সালের পুজোর…

Read More

আমার সমর্পণ

রবীন্দ্রনাথের সমর্পণ, সমর্পণের রবীন্দ্রনাথ  ‘আমার হৃদয়বৃত্তিগুলো যদি আমাকে নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরাত আর যাই হোক কোনও রূপসৃষ্টি সম্ভব হত না’ — কিছুদিন আগে দ্বিজেন্দ্রলাল রায় ও অতুলপ্রসাদ সেনের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের একটা কথোপকথনে পড়লাম এই কথাটা। সেই থেকে আগ্রহের পায়চারি আর সন্ত্রাস যুগপৎ খেলে যাচ্ছে আমার ভিতরে। আগ্রহ – কেননা কথাটি মাত্র এক লাইনের হলেও তার গায়ে লেগে আছে একজীবনের পরিশীলনের ছায়া। তার মন। সেই মনের আলো-হাওয়া-চরিত্র। আসলে কথাটা সব শিল্পীর, সারাজীবনের। ভাবি, হৃদয়বৃত্তি যদি প্রবল না হত তবে কী করে লিখলেন সেইসব গান যা পূজার ঘরে কাটাকুটি খেলতে খেলতে আসলে…

Read More

ইংরেজি ও রবীন্দ্রকুন্ঠা

রবীন্দ্রনাথ যখন নোবেল পুরস্কারের সম্মানে ভূষিত হলেন তখনও তাঁকে কোনো অভিনন্দন বার্তা পাঠাননি কবি রবার্ট ব্রিজেস্; অথচ তিনিই বৎসরাধিককাল পরে ১৯১৫-র মার্চের প্রথমার্ধে Gitanjali-র কয়েকটি কবিতা নিজে সংস্কারের আগ্রহ প্রকাশ করলেন। অনুমতি চেয়ে চিঠি লিখলেন রবীন্দ্রনাথকে। অবশ্য এর পূর্বেই ১৯১৪-র ৭ই জুন তিনি অভিনন্দন জানিয়েছেন নোবেলবিজয়ী কবিকে। কিন্তু, সে অভিনন্দনের ভাষা বিচিত্র ধরণের এবং কৌতূহলোদ্দীপক। কবিকৃত অনুবাদ প্রসঙ্গে স্বাভাবিকভাবে এ প্রশ্ন এসে যায় যে শুধু ব্রিজেস্ নন, ডব্লিউ.বি. ইয়েটস্ সহ অন্যরাও রবীন্দ্রকৃত অনুবাদের সংশোধন, পরিমার্জন ও পরিবর্তনে আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন কেন? তার কারণ কি রবীন্দ্রনাথ নিজেই ? রবীন্দ্রনাথের কবিতা, গল্প…

Read More

শম্ভু রক্ষিত, শ্রদ্ধাভাজনেষু

  যতদূর মনে পড়ছে, ইংরাজি ২০১৮-এর  শেষ প্রান্তে শম্ভুনাথ চট্টোপাধ্যায়ের জীবনাবাসন হয়। প্রায় একই সময়ে, আরও একটি দুঃসংবাদ আমাদের বিমূঢ় করেছিল, যখন শম্ভু রক্ষিত-কে, আমাদের সকলের শম্ভুদা-কে, গুরুতর অসুস্থ অবস্থায়, চিকিৎসার জন্য পূর্ব মেদিনীপুরের বিরিঞ্চিবেড়িয়া থেকে কলকাতায় নিয়ে আসা হয়। এর কিছুদিন পর, হাওড়ার ঠাকুরদাস দত্ত ফার্স্ট লেনে জন্মগ্রহণ করা শম্ভু রক্ষিত-কে কিঞ্চিৎ সুস্থ শরীরে আবার ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় বিরিঞ্চিবেড়িয়ায়, কিন্তু তখন থেকেই কারুর-কারুর মনে আশঙ্কা জন্মাচ্ছিল, এইবার, এতদিনে, বৃত্ত বুঝি সম্পূর্ণ হতে চলল। অবশেষে, সম্পূর্ণ হল সেই বৃত্ত। বিগত আঠারো মাস ধ’রে তিনি কি তাঁর অনুরাগীদের নিজের মৃত্যুসংবাদের ভার বহন করবার…

Read More

পাহাড়পর্বত, মেঘমালা

শম্ভুদার প্রয়াণে আমি শোকাচ্ছন্ন। তাঁর সম্পর্কে কিছু লিখতে গিয়ে আমার দুচোখ সজল হয়ে উঠছে। তাঁর মৃত‍্যু সংবাদ পেয়ে আমি এই অচল-জগৎ পরিস্থিতিতে তাঁর শেষযাত্রায় যেতে পারিনি এজন‍্য মন বিষণ্ণ। সে মন নিয়েই কিছু লিখছি। সে গত গত শতাব্দীর ষাটের দশকের শেষার্ধ। ১৯৬৭-৬৮ সাল। স্কুলের অষ্টম-নবম শ্রেণীর ছাত্র আমি, আমাদের শহরের অগ্রজ কবিতাপ্রয়াসীদের উৎসাহদানে আমি তখন কবিতা রচনায় সবে সচেষ্ট হয়েছি। তাঁরা আমাকে কিছু কিছু কবিতার বই, লিটল ম‍্যাগাজিন দিতেন। সেসব থেকেই, ওই সময়, শম্ভু রক্ষিতের কিছু কবিতা পড়ি। সোমনাথদা, সোমনাথ মুখোপাধ‍্যায়, রমাদি, রমা ঘোষ, শৈলেনদা, শৈলেনকুমার দত্ত, আমাদের এই শহরে…

Read More

শম্ভু ও সিকিমের ছাম্ব্ হ্রদ

মেদিনীপুরের মাটি ফুঁড়ে বেড়ে ওঠা কবি- শম্ভু রক্ষিত। প্রাসাদ-পিরামিড-ড্রাগন-গন্ধর্ব অধ্যুষিত এক অলৌকিক বৈভব ও সম্ভোগের জগৎ। তা আকাশে মেঘের সৌধমালা। শম্ভুর ব্যক্তিজীবন নিয়ে অনেকেই মন্তব্য করেন। কিন্তু তার কবিতার কোনো আলোচনা কোথাও দেখিনি। অথচ গত তিন দশকের বাংলা কবিতার ইতিহাস যখন লেখা হবে তখন শম্ভুর কথা আসতে বাধ্য– যা তথাকথিত মূল স্রোতের অনেক কবির বিষয়েই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। যদি ইয়োরোপের ১৯ শতকের নের্ভাল কি ২০ শতকের ডাডাইস্ট কি ফিউচারিস্ট কবিরা এখনও আমাদের কৌতুহল উদ্রেক করে থাকেন, তবে ব্যাপক না হলেও বলা যায় যে আগামী কয়েক দশকে শম্ভু বিষয়েও…

Read More

এক উদ্বৃত্ত মানুষের কবিতা

শম্ভু রক্ষিতের প্রয়াণের দিন, তাঁরই সমবয়সি একজন কবিকে সোসাল মিডিয়ায় মন্তব্য করতে দেখেছি যে, শম্ভুর মৃত্যুর সঙ্গে শেষ হল ‘এক অসম্ভবের যাপন’। এবং তারপর আরও অনেকেই ওই কথাটি মাঢ়ীতে চেপে জাবর কেটেছেন। সবারই লক্ষ্য শম্ভুর ব্যক্তিজীবন যাপনের দিকে। এভাবেই আমরা প্রায় সকলেই তাঁর জীবনযাপনে কৌতূহলী হয়ে তাঁর কবিতাকে নজর করিনি সেভাবে। আর তাঁর জীবনানুষঙ্গে যে তাঁর কবিতাকে খোঁজা অহেতুক, তা তিনি নিজেই জানিয়েছেন। ‘কবির ভিতর-বাহির অপাংক্তেয়’, তাই কবিতাকে জীবনচরিতে খুঁজতে চাওয়া, আসলে কবিতাকেও অপাংক্তেয় করে দেখার দুরভিসন্ধি বই আর-কিছু নয়। অথচ আমরা খেয়াল করলামই না, আমাদের চিরাচরিত কবিতাচর্চার পাশে তাঁর…

Read More

বাংলা কবিতার স্বাধীন পুরুষ মহাপৃথিবী’র কবি শম্ভু রক্ষিত

একটা গোটা জীবন ছিল কবিতার জন্য উৎসর্গ। শুধু কবিতাকে ভালবেসে পার্থিব সুখকে হেলায় উপেক্ষা করে সুদীর্ঘকাল ধরে নিষ্ঠা ও ধৈর্য্য সহকারে; ঘন্টা বাজিয়ে ছুটন্ত ঢেউয়ের শব্দে বাংলা সাহিত্যে নতুন ভাষা চয়নের মাত্রা যোগ করেছিলেন মহাপৃথিবীর কবি শম্ভু রক্ষিত। তিনি গত ২৯ জুন সকাল আটটায় নিজস্ব বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। শুভানুধ্যায়ী, গ্রামবাসী, আত্মীয় পরিজনবেষ্টিত হয়ে পুত্র, জামাতা, এক সাহিত্য সেবকের কাঁধে চেপে মহাপ্রস্থানে চলে গেলেন বাংলা সাহিত্যের ব্যতিক্রমী কবি শম্ভু রক্ষিত। স্থানীয় চাঁপী-পানা শ্মশানে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।  প্রথাগত শিক্ষার প্রতি তাঁর কোনদিনই আগ্রহ ছিল না। হাওড়ার নরসিংহ দত্ত কলেজে…

Read More

শম্ভু রক্ষিতের কবিপ্রতিভার রহস্য

‘The poet is like the prince of the clouds who haunts the tempest and laughs at the archer. Exiled on the ground in the midst of the jeering crowd, his giant’s wings keep him from walking.’  — Baudelaire    ১৯৭১ সালে প্রকাশিত বইয়ের (‘সময়ের কাছে কেন আমি বা কেন মানুষ’)  একটি কবিতায় কবি শম্ভু রক্ষিত লেখেন : ‘রবি ঠাকুর বা নজরুল নই আমি, আমি শম্ভু রক্ষিত :’  এ কবিতাতেই আরও (‘আরামখেকো ঈশ্বরের প্রতি’) পড়ি : ‘আমি একজন কবি, আমি বাংলার কমার্শিয়াল বুদ্ধিজীবীদের গুম করে জখম করে দিতে চাইছি।’  উত্তম পুরুষ…

Read More

রবির মাংপবী-৪

মংপু পর্ব   ৩ মংপু-মুগ্ধ রবীন্দ্রনাথ   ‘…এই কাচের ঘরটা বুঝি আমার লেখবার? এ তো খুবই ভাল, একেবারে উত্তম বলা যেতে পারে। এ চৌকিতে সকালবেলা বসব আর রোদ্দুর এসে পড়বে কাচের ভেতর দিয়ে। তোমার ঐ বৃহদাকার বনস্পতির পাতার ফাঁক দিয়ে শতধারায় ঝরে পড়বে সকালবেলার আলো, ভোরের সেই রৌদ্রস্নানটি আমার কত সুন্দর হবে।’ বারান্দা দিয়ে ঢুকে বাঁদিকের প্রান্তে যে কাচঘেরা পড়ার ঘরের কথা উল্লেখ করেছি আগের পরিচ্ছেদে, এই প্রশংসা সেই ঘরটাকে নিয়েই, অন্তত বর্ণনা তো একেবারে মিলে যাচ্ছে। ছোট্ট ঘরটার দরজা, জানলা ধবধবে সাদা রঙে শোভিত। ফলে কাচের মধ্যে দিয়ে আলো…

Read More

অল আই হ্যাভ ইজ আ ভয়েস

প্রতি মুহূর্তে রাষ্ট্রের এমন এমন চিল-ঠোক্কর মানুষ শেষ কবে দেখেছে? আমাদের যাদের বয়স ত্রিশের কোঠায়, তারা এই প্রথমবার, এই দেশে। এমন অ্যাটেনশান সিকার রাষ্ট্র-ব্যবস্থা আমরা এর আগে নাৎসি জার্মানির ইতিহাসে দেখেছি, সিনেমায়, গল্পে। সত্যি বলতে এক ত্রাসের অনুভূতি ছাড়া বাকি অনুভূতিগুলো কেমন যেন বসে যাওয়া গলার মতো মোটা আর ক্ষীণ হয়ে আসছে। ভয় হচ্ছে। সত্যিকারের ভয়। ভাবি, এই তো একটাই মানবজীবন! তাকে কি তবে এবার থেকে এই এইমাত্র ত্রাসের অনুভূতি নিয়েই বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিতে হবে, বা জীবনের বড় একটা অংশ এই ভয় ত্রাসের ঘরে যুঝতে যুঝতে ফুরিয়ে যাবে! লক্ষ…

Read More

অন্ধকার দিনগুলিতে অনুবাদ

লেখার বিষয় যতটা অনুবাদ, ঠিক ততটাই এই অন্ধকার দিনগুলি। যখন ধর্মের ভিত্তিতে জনগণকে ভাগ করার চেষ্টায় ভয়ানক তৎপর বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার। নয়া নাগরিকত্ব আইনের প্রণয়ন এবং তা রুজু করার মাধ্যমে তারা বাতিল করে দিতে চাইছে এক বিশাল সংখ্যক জনগণের অস্তিত্ত্ব এবং তার সংশোধনকারি আইনের দ্বারা তারা বাতিল করছে সম্পূর্ণ মুসলিম সম্প্রদায়কে যারা ভারতবর্ষের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। অন্য সমস্ত ধর্মের নাম থাকলেও সিএএ থেকে নির্দ্বিধায় এই হিন্দুত্ববাদী সরকার বাদ দিয়েছে মুসলিম ধর্মের নাম। এটাই স্বাভাবিক যে এর বিরুদ্ধে সারা ভারতবর্ষের সমস্ত সাধারণ নাগরিক, প্রতিবাদ করবেন, আওয়াজ তুলবেন, রাস্তায় নামবেন। দেশব্যাপী এই প্রতিরোধের পুরোভাগে রয়েছে এদেশের ছাত্রী…

Read More

সাম আর মোর ইকুয়াল দ্যান আদার্স

সরকারবাহাদুরের সমালোচনা।  ১৯২৫। ফোর্ডের মডেল-টি গাড়ির চাহিদা তখন এতটাই তুঙ্গে যে হেনরি ফোর্ড নিশ্চিন্তে বলে দিলেন “A customer can have a car painted any color he wants as long as it’s black”। মোদ্দা কথা হল রং নিয়ে ত্যাঁদড়ামি করলে চলবে না, যা বানাচ্ছি তাই নিতে হবে নইলে কেটে পড়ো। “কাস্টোমার ইজ দ্য কিং” গোছের কথা তখন মূল্যহীন। ফোর্ড সাহেবের সেই বিখ্যাত উক্তির টেম্পলেটেই দিব্যি সাজিয়ে দেওয়া যায় এখনকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি; ““A Citizen can say anything about the Government as long as it’s Pro-Government”। অর্থাৎ গদগদ ফর্ম্যাটে সরকার বাহাদুরের প্রশংসা না…

Read More

এখানে আকাশ নীল ও পেঁয়াজ দশ টাকা

হেডিং পড়ামাত্র, পাঠক, আপনি ভাবলেন, কোথায়, কোথায় সেই জায়গা! তাহলে ‘রথ দেখা কলা বেচা’—র মতো সেখানে একটা টুর, হালকা বেড়ুবেড়ু তো বটেই (ওটা ফাউ) আর ফেরার বেলা কাঁধে বগলে মাথায় করে পেঁয়াজ ভর্তি বস্তা। আহা! ‘ঘুরতে গিয়ে আমার জন্য কী আনলি?’ বলা আত্মীয়স্বজনও পেঁয়াজ—সম স্তরে স্তরে খুশি। পিঠপিছে নিন্দে করা আত্মীয়, বন্ধুবলয়ের কাছেও উপহার পৌঁছনো মাত্র ঝাঁঝ গায়েব। আরও কী কী প্ল্যানিং হতে পারে, ভেবে নিন। জায়গার নাম বলছি। তার আগে, একটা স্বীকারোক্তি প্রয়োজন। পেঁয়াজের দামখানা পড়ামাত্র হয় আপনি চমকে গিয়েছিলেন, কিংবা ভেবেছিলেন কোনও রূপকথা, তাই তো? মোটমাট, বাস্তবের গন্ধ…

Read More

রবির মাংপবী

মংপু পর্ব “নির্জন গিরি শিরে বিরচিলি চম্পূ তারেই কি নাম দিলি মংপু?” ১ চলো মংপু কালিম্পং থেকে রওনা হতে খানিক দেরিই হল আমাদের। মংপু অন্তত দু’ঘণ্টার পথ। এই যাত্রাতেও আমাদের চালকের আসনে সুদীপ। গাড়িতে করে যখনই কোথাও যাই, সামনের সিটে ড্রাইভারের পাশে বসাটা আমার বিশেষ প্রিয়। চারপাশের উন্মুক্ত দৃশ্যের অবাধ হাতছানি তো থাকেই, আরও যে ব্যাপারটা আমাকে টানে, সেটা হল, স্টিয়ারিং হাতে পাশে বসে থাকা মানুষটির সাথে একাত্ম হয়ে যাওয়ার মিষ্টতা। বিশেষত, অচেনা জায়গায় তারাই হয়ে ওঠে অলিখিত পথ-প্রদর্শক। বাপ-ঠাকুদ্দার মুখে শোনা গল্পগুলো কী সুনিপুণ ভঙ্গিতে ইতিহাসের তথ্য-সমৃদ্ধির পাশে নিজস্ব…

Read More

কালিম্পং পর্ব-২

৩. মৃত্যুশ্রান্ত কবি   ঐতিহাসিক রেডিও-অনুষ্ঠানের কয়েকদিন পরই ২১শে মে কবি শেষপর্যন্ত মৈত্রেয়ীর আবদার রক্ষা করে মংপুতে গিয়েছিলেন। এরপর আরও তিনবার তিনি মংপু এসেছেন। কোনওবার শিলিগুড়ি থেকে সরাসরি, কখনও বা কালিম্পং হয়ে। শেষবার যখন মংপু এলেন ১৯৪০ সালে, সেবার আগে কালিম্পং এসেছিলেন। তারপর একদিন পরেই মংপু যান। কিছুদিন মংপুতে কাটিয়ে আবার কালিম্পঙে ফেরেন। কালিম্পঙে পৌনে দু’মাস কাটিয়েছিলেন (৭ই মে থেকে ২৯শে জুন)। সেবারের পর্বতবাসের অধ্যায়টি জুড়ে কেবলই প্রিয়জনের মৃত্যুযন্ত্রণায় বিদ্ধ হয়েছেন চির-আনন্দময় কবি। কালিম্পং যাওয়ার কয়েকদিন আগেই মারা গেলেন চার্লস ফ্রিয়ার অ্যান্ড্রুজ। কবির কর্মজীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সহকর্মী। ১৯৪০-এর শুরুতেই কলকাতায়…

Read More

কালিম্পং পর্ব

  “আমার আনন্দে আজ একাকার ধ্বনি আর রঙ, জানে তা কি এ কালিম্পঙ।” ১. বাস্তবে ব্রজেন, সিনেমায় ব্রাউন    পাহাড়ি সবুজের পরতে পরতে তখন শেষ শরতের ঔজ্জ্বল্য। শিলিগুড়ি থেকে রওনা হয়েছিলাম সকাল ন’টায়। কালিম্পং পৌঁছেছি তখন বেলা এগারোটা অতিক্রান্ত। বাংলার পাহাড়ের এমনিতেই একটা আপন করে নেওয়ার আলাদা আকর্ষণ রয়েছে। তার উপর এই অঞ্চলে এই প্রথম। চারিদিকে একটা অভ্যর্থনার ভাব। তার উপর গত কয়েকদিনের ঝড়বৃষ্টি-ধসের পালা কাটিয়ে উঠে রোদ ঝলমলে কালিম্পং যেন নতুন রূপে আবির্ভূতা।  পরিবারস্থ অন্যান্য সকলের মধ্যে আছে আমার তেরো-বছর বয়সী অনুজ ভ্রাতা। আমার সহকারী, আমার ছায়া। মনটা কাঁচা।…

Read More

স্ববিরোধ, মহানতা, ক্লিশে

“মহান শিল্পীদের জীবনীতে প্রায়শই পড়ি তাঁদের অকল্পনীয় নিষ্ঠুরতা কথা। পড়ি, এবং ভীষণ বিভ্রান্তবোধ করি। ভাবি যে, যে-মানুষ ব্যক্তিজীবনে এতটা হৃদয়হীন এবং নির্মম, তাঁর শিল্পের আদৌ কী দাম আমি দেব? যতই মহৎ হোক সেই শিল্পকীর্তি, তবু আমি তার কানাকড়ি মূল্যও দেব কি? পণ্ডিতেরা বলেন, ভুল, এই বিচার ভুল। শিল্পীও একজন মানুষ, আর সব মানুষের মতো তার ভিতরেও রয়েছে একই সঙ্গে সাধু এবং শয়তান। এবং নিজের ভিতরে এই সাধু-শয়তানের দ্বন্দ্ব থেকেই সৃষ্টি হচ্ছে তার শিল্প। সুতরাং, শিল্পীর ব্যক্তিজীবন দিয়ে তার শিল্পের বিচার এক মারাত্মক ভুল। পণ্ডিতেরা সর্বদাই এত ঠিক কথা বলেন! এত…

Read More

হার আর্মস ফুল অফ ফ্লাওয়ার্স : ওয়াইন, পারফিউম ও কবিতার গঠন সম্পর্কিত একটি গবেষণা  

  ১.  এ জীবনে, বস্তুগতভাবে, অনেকের মতো আমারও দুটো প্রিয় জিনিস হলো মদিরা ও আতর– ওয়াইন ও পারফিউম। দুটোই ফরাসী, প্রধানতঃ। খাঁটি ফরাসী সুগন্ধী ও ফরাসী ওয়াইনের স্বাদ-গন্ধ মাত্র কখনো আমি পেয়েছি। সেই থেকে মনে হয়েছে, সমর্পিত হওয়ার জন্যে এর চেয়ে ভালো আর কী-ই বা হতে পারে। ফ্রান্স ও ইতালির সেইসব মাইল মাইল বিস্তৃত রৌদ্রকরোজ্জ্বল আঙুরের খেত– বার্গান্ডি, টাসকানি ! ‘স্টিলিং বিউটি’-ছবিতে বার্তোলুচ্চি সেই টাসকান ভূখন্ডের এক ঝলক  দেখিয়েছিলেন।    সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় একবার লিখেছিলেন, মৃত্যুকালে যেন মুখে কিছু চিনি নিয়ে মরি। কেন যে চিনির মিষ্টত্ব ইচ্ছা করেছিলেন জানি না। তবে মদের…

Read More

নারীর কবিতা, মানুষের কবিতা

ভাবনা কোথা হতে আসে ! ভাবনারও নিশ্চয় প্রেক্ষাপট আছে , আর সে প্রেক্ষাপট ভিন্ন কবি কি লিখতে পারে ? কবির অন্তর্গত ক্ষরণ, বেদনা, হাহাকার, সুখানুভূতি ব্যতিত ভাবনার উদয় হয় কি! সেসব অনুভূতিসমূহের আন্দোলন ছাড়া তো ভাবনা আসে না। কবিতা কবির কাছে নৈঃশব্দ্য ধ্যানের এক নাম। সমস্ত যাপন থেকে ইচ্ছে পালানোর নাম। মেঘের ওড়া, বৃষ্টির ঝরেপড়া, পাতার মর্মর, ঘাসের ডগায় ফড়িঙের বসার ভঙিমা এসব চিরাচরিতের মাঝে নতুর রঙ এনে দেয়া এক হকিয়ার। কবিতা কবির একচিলতে উঠোন যেখানে ইচ্ছেমত পাতা ফেলা, নিকোনো, ঝাটপাট দেয়া, রোদ পোহানো, কিংবা জোছনা মেখে শুয়ে থাকা চলে।…

Read More