দেবারতি মিত্র

দেবারতি মিত্র-র ১৫টি কবিতা

নির্বাচন: অরণি বসু

ভূমিকা –

অনিমিখ, দেবারতিদির দশটি কবিতা নির্বাচনের যে দায়িত্ব তুমি আমাকে দিয়েছিলে এবং আমি সেই প্রস্তাব সাগ্রহে গ্রহণ করেছিলাম, কাজটি করতে বসে বুঝলাম দেবারতি মিত্রের মত একজন কবির অসামান্য সব কবিতার মধ্যে থেকে দশটি কবিতা নির্বাচন করতে যাওয়ার চেষ্টা করাও অপচেষ্টা মাত্র। বাছাই প্রক্রিয়া থেকে কবিতাসমগ্রের কবিতা প্রথমেই বাদ দিলাম। কবিতাসমগ্র প্রকাশের পরবর্তীকালের গ্রন্থিত ও অগ্রন্থিত কবিতাবলীর মধ্যে থেকে দশটি নয় পনেরটি কবিতা আমি নির্বাচন করলাম। দেবারতি মিত্রের সমগ্র কবিতাবলীর বিচারে আমার পছন্দসই কবিতার তালিকার প্রেক্ষাপটে এই নির্বাচন হিমশৈলের চূড়ামাত্র। তবুও আমার নির্বাচন পাঠকের পছন্দ স্পর্শ করতে পারলে কৃতার্থ হব।

শুভেচ্ছা,
অরণি বসু
২১/০২/২০২৪

আমার ন্যাংটাপুঁটো ছেলেটাকে

আমার ন্যাংটাপুঁটো ছেলেটাকে
কে ভুলিয়ে নিয়ে চলে গেল!
কথা বলতে পারে না,
মা কোথায় জিগেস করলে
চোখ দিয়ে মা দেখায়।
কে তাকে নাইয়ে দেবে, খাইয়ে দেবে
চুল আঁচড়ে দেবে?
তার ওপর অভিমান করব, তার দোষ ধরব আমি?
সে যে ষোলো আনার ওপর আঠারো আনা বোকামি।

মাথা ব্যথা করলে উঁ উঁ করে,
পেট কামড়ালে কড়ে আঙুল নাড়ে, এসব শুধু তুমি-আমি বুঝব।

কোন ছেলেধরা আমাকে সর্বস্বান্ত করলে!

 

বাচ্চাটার বেড়াবার সময়

কিছু মনে থাকে না বলে আজকাল
ঘড়িতে এলার্ম দিয়ে রাখি।
বিকেল সাড়ে পাঁচটা বাজল,
এখন তো বাচ্চাটার বেড়াবার সময়। আমগাছের রোদদাদারা, বকুলগাছের ছায়াদিদিরা
ওর সঙ্গে যাবার জন্যে রেডি।

মানি বেড়াল ছুটে এসে বলে গেল-
মনাটা কোথায় লুকিয়েছে, খুঁজে দেখছ না। আরে, খুঁজব কোথায়?
নিজের পুরো নাম জানে না, আমার নাম,
বাড়ির ঠিকানা কিছুই জানে না।
সব জায়গায় কি চোখ দিয়ে মা দেখালে চলে।

বেলা পড়ে গেল।
ঝিনুকের মতো সপ্তমীর চাঁদ
ওকে দুধ খাওয়াবার জন্যে মুখিয়ে আছে। সব সময় ছেলেখেলা করলে
কে ওর সঙ্গে পারবে?

 

মানির আহ্বান

পৃথিবীর সঙ্গে কি সম্পর্ক?
সমুদ্রের তীরে মনা বালিতে গড়াগড়ি দিয়ে খেলা করছে।
বুড়ো আঙুলের মতো ছোট্ট, কাঁচা হলুদের মতো গায়ের রং,
মুখের ভেতরটা গোলাপি-
ওইরকম দেখতে অসংখ্য সঙ্গীসাথি জুটেছে।

কী নীল, কী নীল সমুদ্র।
দূরে দূরে গাছেরা মেঘ আর মেঘেরা গাছ। মনাটার গায়ে একতিল সুতোও নেই,
ওদের কারুরই নেই।
ওরা খিলখিল করে হাসছে
যেন দুধের সরের গান গাইছে।

মানি বেড়াল বললে-
যাও, যাও, তাড়াতাড়ি ছুটে যাও,
মনা মাঝে মাঝে খুঁতখুঁত করে কেঁদে ওঠে তুমি ও-ও করে চাপড়ালে তবে থামে। ছেলে-মরা মায়ের মতো মুখ করে আছ কেন?
চলো, আমার সঙ্গে চলো।

 

মনাটা কোথায়

ওর মুখে মুখ দিয়ে ও ও ও ও করলে
অসুখ সেরে যায়।

এখন বাচ্চাটা কোথায় কোন জঙ্গলে
জ্বরে কোঁ কোঁ করে কাঁপছে।
বাঘের ডাক শুনে বড্ড ভয় পায়,
শেয়ালের ডাকেও পায়।
রাতের বাতাসে গাছপালার আফসানি শুনে
ভাবে ডাইনি ওকে ধরতে আসছে।

আকাশের তারাগুলো ওকে
মাসিপিসির মতো দেখাশোনা করলে তো পারে,
চাঁদমামা কপালে টি দিতে পারে না?

মানি বেড়ালকে বলছি
মনা কোথায়, চল নিয়ে আসি।
সে মার্বেলের গুলির মতো মেঝেতে
একঠায় পড়ে আছে তো পড়েই আছে।

 

জন্ম-জন্ম চা খাইনি

লোকে ভাবতেই পারে না
অথচ চোখের সামনে,
ভেঙে টুকরো টুকরো ফুলদানি
লাফিয়ে লাফিয়ে জুড়ে
আস্ত হয়ে গেল।
এখন ওতে জবা না চন্দ্রমল্লিকা
সে ঠিক করবে তুমি।

আমার ভাঙা চায়ের কাপটা
যদি অমন নিটোল করে দিতে পারো,
আমি চা খেয়ে বাঁচি।
আমার বুকে একসমুদ্র তেষ্টা-
যেন জন্ম-জন্ম চা খাইনি।

 

পান

আমি দুপুর বেলা বাটা খুলে
মৌরি, মিছরি, চুয়া দিয়ে পান সাজি।
মনা কোলে বসে গলা জড়িয়ে ধরে
আমার মুখ থেকে চিবোনো পান খায়।
আমি বলি-

এ-হল জাদু পান, ডাইনি পান,
সংসার ছারখারে যাবে, জীবন ছারখারে যাবে,
তবু পান শেষ হবে না।
মনা চোখ বড়ো বড়ো করে শোনে,
সব কথা বিশ্বাস করে।

টুনটুন করে সে পান চিবোয়,
আমার স্বপ্ন খায়, টপ্ন খায়,
একফোঁটা ছিবড়েও ফেলে না।

 

এই অন্নভোগ

শোকের আগুনে
অশ্রুজলে সেদ্ধ হতে হতে
একমুঠো চাল আমার জীবন
আজ হাঁড়িভরতি ভাত
উথলে পড়ছে, উপচে উঠছে।

এই অন্ন কেউ খাবে?
এই অন্ন কাকে দেব?
এসো, বোসো,
তোমাকেই আস্তেব্যস্তে বেড়ে দিই-
তুমি খাও, খেয়ে তৃপ্ত হও।

 

আজ গন্ধরাজ ফুল

মৃত্যুর পরে আজ আমি পল্লবিত হয়ে উঠছি, ফুটে উঠছি গন্ধরাজ ফুল।
মৃত্যুর পরে তো এমনই হয়,
ভারী পাথরটা সরে গেছে,
ফনফন করে বেড়ে উঠছে গাছ।
আমার যত কিছু ঢাকা, চাপা, অন্তর্নিহিত সবই আজ খোলা আকাশের তলায় দ্বিধাহীন, ব্যথাহীন।

এইরকম স্বতঃস্ফূর্ত দিন চেয়েছি তো আমি, চেয়েছিলে তুমি।
অলিম্পিক দৌড়ে ফার্স্ট হওয়া বিস্ময়বালিকার মতো
আজ নির্ভার ঝরঝরে আমার প্রাণ। আমাকে অভিনন্দন জানায় মাটি,
বৃষ্টি, রোদ্দুর, নক্ষত্রেরা হেসে বলে
সব ভালো যার শেষ ভালো।

খোলামেলা নিরাকাশে আজ আমি গন্ধরাজ ফুল হয়ে ফুটে উঠছি।

 

পাতার বাড়িতে

পাতার বাড়িতে যাই এক পা এক পা করে সিঁড়ি বেয়ে টঙে উঠি।
চটি খুলে ঘরে ঢুকি। রেখে আসি
স্বচ্ছ এক গ্লাস জল, চা ও অশ্রু, খবর কাগজ।
কে আসে, কে চলে যায়, ভ্রূক্ষেপ নেই তার- দোলনাগড়ন ছায়ার ভঙ্গিতে চায়,
মায়ার প্রস্বরে কথা বলে,
গলাগলি করে শুনি আলো-বাতাসের সঙ্গে। ভুলে যায় আমারও তো তৃষ্ণা থাকতে পারে।

নীচে ক্ষুধা, সবই জানে-
অনিবার্য খুন ও প্রশ্রয়,
পরিত্রাহি জীবজন্তু অরণ্য ও বন।
ছন্নছাড়া মন কাকে বা আশ্রয় করে বেঁচে থাকে,
কাকে বলে সমস্যার কথা?

সন্ধ্যাবেলা যাইনি তো কোনোদিন।
তখন কি নীলাভ অন্তর ফেটে তার আলো জ্বলে,
তখন কি মানুষের ভবিষ্যৎ পাঠ করো
তার সঙ্গে শরীরী তুমিও?

 

জীবনেও চাই

যে একবার চলে যায়,
সে কি বারবার ফিরে আসে?
পাহাড়ের বুক থেকে জলপ্রপাতের অজস্র ঝর্ঝর,
নামতা পড়ার সুরে বৃষ্টি টিপটিপ,
জুঁই ফুল ফুটে ওঠবার আগে ফোঁপানো কান্নায়
আমার রক্তস্রোতে তাকে শুনতে পাই।

শব্দে আসে, দৃশ্যে তো আসে না।
আমি তাকে স্পর্শে, গন্ধে, নীলাকাশে, সমীরণে,
জীবনেও চাই।

 

করুণ ধুনোর গন্ধ

বেদনা সইলেই সওয়া যায়-
এ কথাটা বিশ্বাস হয় না আজকাল।
দেখেছি ঠাকুরঘরে সন্ধেবেলা ধুনোর গন্ধেরও মৃত্যু হয়-
আর সেরকম করুণ মধুর আবহাওয়া ঘনায় না।
বিদায়ের অ্যাম্বুলেন্সে করে বন্ধু আত্মীয়, আত্মজন
আমাকে ছেড়ে চলে গেছে, তারা আর কখনো ফিরে আসেনি।

সিমেন্টের দোকানে ছেলেটা অহরহ বস্তা পাড়ে,
বস্তা তোলে, বস্তা পেড়ে আনে।
পাতা খাসনবিশ ছেলে পড়ায়, মেয়ে পড়ায় চাকরি থেকে খারিজ হয়ে
সুদিনের মুখ চেয়ে বেঁচে থাকবার চেষ্টা করে।
ওদের কষ্টটা আমারই কষ্ট যদি বলি
তবে হয়তো মিথ্যে বলা হবে।
‘অসুখে অসুখে তোমার মস্তিষ্কে ছাতা পড়ে যাচ্ছে তাই ভালোটা দেখতে পাও না-‘
বলে বান্ধবী সিংহল দেখতে চলে গেল।

আমাদের ঠাকুরঘরে পুরোনো ধুনোর গন্ধ আজ হারিয়ে গেছে
আর কখনো ফিরে আসবে না।

 

আবহমান

আমার চোখের সামনে
শুকনো কালো গাছটা সবুজ হয়ে গেল—
একঝাঁক টিয়াপাখির কলম্বর,
রোদবৃষ্টি আলোছায়া
তবু আমি কি হাসব না, কথা বলব না আকাশের সঙ্গে?

তুমি আমাকে রাতদিন শেখাও
আলো যেমন সত্য, অন্ধকারও সত্য। তোমার সঙ্গে আমার বিচ্ছেদ কখনও হবে না।
সবুজ শুকনো হয় না,
জীবন মৃত্যু হয় না-
আবহমান কাল ধরে এই চলে আসছে।
বিশ্বাস রাখো, বিশ্বাস কর এই সৃষ্টিকে।

 

ঈশ্বর তা চান না

পিঁপড়ে চিনির স্বাদ জানে,
চিনি কি স্বাদ জানে পিঁপড়ের?
জীবন জানে মৃত্যুকে,
মৃত্যু কিন্তু জীবনকে আজও চেনে না।
থোকা থোকা করবী ফুল পৃথিবীকে উপভোগ করতে চায়, পারে না।
পৃথিবী তাকে শিশু সন্তানের মতো
কোলে নিয়ে নাচায়, দেয়ালা আদর করে।

পারস্পরিক সম্পর্ক কে কবে দেখেছে?
শুধু দেখেছিলাম আমরা দুজনে।
সর্বাঙ্গীণ প্রেম ও অশ্রুকণা, হাসি
আমরা অনুভব করে ভাগ করে নিয়েছিলাম।
আমরা বরাবর সৃষ্টিছাড়া,
তাই কেউ কখনও কাউকে ছাড়তে পারি না।

ঈশ্বর তা চান না।

 

কুলত্থ কলাই

বিকেলে চা খাবার আগে
ওর জন্যে কুলত্থ কলাই ভেজাতাম, এখন ভেজাই না।
ও খায় না, বোধহয় ওর ভালো লাগে না। অথচ আমি স্নান করে উঠলেই বলে,
‘ভালো করে চুল আঁচড়াও,
তোমার যে আলুখালু ধরণ ধারণ লোকে বলবে পাগল’।
খেতে বসে তেঁতুলের আচার ভাতের সঙ্গে বেশি খেয়ে ফেললে বলে,
‘অত টক তোমার সহ্য হয় না জানো, তবু খেলে?’
দুপুরে বিছানায় শুলেই কড়া হুঁশিয়ারি,
‘উঠে বসো, উঠে বসো। রাত্রে জেগে থাকতে হবে কিন্তু’।
ও যা বলে শুনি।
আমার একমাত্র পৃথিবী, ওর কথা অমান্য করি না কক্ষনো।
ভুলেও দুজনে কবিতার নাম উচ্চারণ করি না,
ওতে দুজনেরই অরুচি।
পরে ওসব নিয়ে তর্কবিতর্ক হবে
সময় তো পালিয়ে যাচ্ছে না।

 

তুমিও সেখানে

এত ধড়পড় করছ কেন, এত ছটপট করছ কেন?শুকনো লাল গোলাপের পাপড়ির মতো দাগগায়ে যদি লাগে, লাগলই বা।এখন শেষবেলা না ভোরবেলা তাই তো সঠিক জানো না।
টাওয়ার পাওয়া যাচ্ছে না বলে আজকে
মোবাইলে কাউকে ধরতে পারছ না।
সময় কাটাও অঙ্ক কষে, জপ করে,
জবাগাছের ফুল গুণে।
আমি তোমাকে ভালো কথাই বলছি,
বাইরে যাবে তো একসঙ্গে একটার বেশি জায়গায়
যেয়ো না।
আমি যেখানে, তুমিও সেখানে-
তাই আমার এত মাথাব্যথা, তাই আমার এত ভাবনা।

 

Facebook Comments

Related posts

Leave a Comment