বাক্যকাব্য

কাছের মানুষের মৃত্যুতে জীবন ক্রমশ দূরতিক্রম্য হয়ে ওঠে। যতক্ষণ না সম্পূর্ণভাবে অনতিক্রম্য হয়ে পড়ছে। চোখের সামনে অনেকগুলো পর্দা তৈরী হয় দূরত্বের। কতোকিছুতে আর ফিরে যাওয়া যায় না। যাবে না। অনেকদিন পর ফ্ল্যাটবাড়ির ছাদে উঠেছে সঞ্জয় । চলে যাবার আগে শেষবার। সন্ধ্যার পড়ন্ত আলোয় ছোটবেলার বদলে যাওয়া শহরতলি। আজকাল আর এবাড়িতে থাকা হয় কই? কর্মসূত্রে রাজ্যছাড়া। রাজ্য? রাজ্য তো রাজার হয়! সঞ্জয় তো নিতান্ত প্রজা! প্রায় দশ বছর আগে লেখা একটা গল্পের লাইন মনে পড়ে যায় ওর: ‘এতোটা ওপরে থাকলে কেমন রাজা রাজা ভাব হয়।‘ ঐ ভাবই বটে! আজ এক দশকের…

Read More

বিপন্ন বিস্ময়গুলি – পর্ব ৩

অভিজ্ঞতাগুলি ক্রমে… শুকনো পাতার স্তূপ্ বললেই মনে পড়ে যায় গ্রীসিয়ান আর্নের কথা। একটি অসামান্য জায়গা ছিল- হার্ড মেলোডিজ আর সুইট, বাট দোজ আনহার্ড আর সুইটার। আমার এক মাস্টারমশাই ছিলেন, পিএম বলে ডাকতাম। পুরো নাম পার্থ মুখোপাধ্যায়। একবার পড়ানো হয়ে গেছে। বসে আছি তাঁর সল্ট লেকের বাড়ির ছাদে। পাশে ঘুরঘুর করছে তাঁর দুই সন্ন্যাসী কুকুর। তিনি হঠাৎ বলে উঠলেন- জানো, এই লাইনটা, বোল্ড লাভারস ক্যান্সট নেভার নেভার দাউ কিস- এই ব্যাপারটাকে ঠিক কিছু দিয়েই ধরা যায় না। আমরা বৃথাই এসব পড়ি। পড়াই। কিন্তু যা বাজে অন্তরে তা মনে হয় আরও বেশি…

Read More

বিপন্ন বিস্ময়গুলি – পর্ব ২

অপ্রত্যাশিতের এই স্পর্শ পাওয়ার জন্য জগতের কাছে সবসময় হাত পেতে বসে থাকতে যে হয়, সেটিই আসল সত্য। মানে, অপেক্ষাই আসলে প্রধান। মিলন নয়। ধরা যাক দুজন মানুষ একে অপরকে ভালোবাসে, তারা একে অপরের জন্য অপেক্ষা করছে। প্রতিদিন প্রতি মুহূর্ত তাদের অপেক্ষা আর ফুরোচ্ছে না। এই না ফুরোনো অপেক্ষাই হল প্রেম। মিলন তো ক্ষণিকের। অপেক্ষাই চিরকালীন। এ প্রসঙ্গে একটি দৃশ্য ও একটি গল্প মনে পড়ছে। আমি বসে আছি দেউরিয়া তালে। সারা রাত ধরে অপেক্ষা করেছি দেউরিয়া তালের ধারে একটি তাঁবুতে। সূর্য উঠবে। পাহাড়ে সূর্যোদয়ের উলটো ছায়া পড়বে দেউরিয়া তালের জলে। দেখব।…

Read More

বিপন্ন বিস্ময়গুলি – পর্ব ১

আমি নিজেকে সবসময় উপলক্ষ্য ভাবি। এই যে কবিতা লিখি, আদৌ আমি কি লিখি? না কি আমি কেবলমাত্র লেখার আধার হয়ে থাকি? ঈশ্বরের কথা জানি না। প্রকৃতির কথা কিছুটা জানি। দর্শন হোক বা বিজ্ঞান, সঙ্গীত হোক বা কবিতা- কোনওকিছুই আমরা নতুন করে তৈরি করছি না, ইংরিজিতে ইনভেন্ট যাকে বলে, যা করছি, তা হল  ডিসকভারি, মানে খুঁজে পাচ্ছি। খুঁজে পাচ্ছি, তার কারণ, আমাদের মধ্যে কেউ না কেউ কোনও না কোনও ভাবে খুঁজে চলেছে। প্রশ্নটা হল, কী খুঁজে চলেছে এবং কাকে খুঁজে চলেছে। আমাদের সমস্ত অসীমেরও ধারণার অতীত এই মহাবিশ্বে নিজস্ব সীমার মধ্যেও…

Read More

একটি অদ্ভুত গল্প

গত সোমবার আমার জীবনে একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছিলো। আজকেও সোমবার। এক সপ্তাহ হয়ে গেলো। কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারছি না ঠিক এক সপ্তাহ আগে ঠিক কী হয়েছিলো। এমন সময় আমার এক পুরনো বদভ্যাস মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। আমি একটার পর একটা পুরনো অপমানের কথা মনে করতে থাকি, যাতে আমার মন বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্ষতিগ্রস্ত হলে কী হয়, মনকে আরাম দিতে আমার অন্য মস্তিষ্ক সচল হয়ে ওঠে। তখন স্মৃতি খুঁজে খুঁজে বের করে আনে এমন সব অদ্ভুত আলোঅন্ধকারস্মৃতি, যার ফলে আমার মন অন্য দিকে ঘুরে যায়, অন্য রাস্তায় হাঁটতে থাকে আমার ভাবনাগুলো,…

Read More

লিন্টেল তাক ও বাঙ্গালির কোক-শাস্ত্র

এক নম্বরঃ গাছের সঙ্গে দূরে যাবার গল্প বলার সময় ভারি শরীরের নারীদের দাঁতে দাঁত লেগে তারা ফিট পড়ে আর বালিকাদের পিঠে ধড়ফড় করতে থাকে ডানা । এই টুকু মনে রাখলেই চলবে । ওহ হ্যাঁ আর দু নম্বর হলঃ তিনটে কাঠবেড়ালির মধ্যে একজন থাকবেই যে কিনা অসাধারণ সাহসী আর কৌতূহলী । একটু বেশীই ।   ‘৭০ সাল নাগাদ কোলকাতার পাকা বাড়িগুলোর লিন্টেল বরাবর ঘরের ভেতর বাগে যে বাঙ্কের মত তাকগুলো বানানো হত, আর তাতে তুলে রাখা হত শীতকালীন ওম-শোম, ঠাকুরের নকুলদানার কাচের হরলিক্স শিশি, আর কিছু চেতন-অচেতন বিস্কুট ও মোয়াপাতি , সেই…

Read More

এক জানলা, একেক বিভুঁই : পর্ব-২

নেকড়ে মায়ের খোঁজ বিশ শতকের বিশ দশক। ব্রিটিশ ভারতের বিভক্ত তবু একদেশী বাংলা। জেলা মেদিনীপুর। গ্রামের নাম গোদামুরি। কাছেই এক খৃষ্টিয় অনাথ আশ্রম। তার অধ্যক্ষ রেভারেন্ড যোসেফ অমৃতলাল সিং। রেভারেন্ডের কাছে গ্রামের মানুষ প্রায়ই এসে একটা গল্প বলে। ভূতের গল্প। দুটো সাদা ভূত নাকি মাঝে মাঝে গ্রামে ঘুরে বেড়ায় এক পাল নেকড়ের সাথে। তারা মানুষভূত না পশুভূত বলা মুশকিল। কেউ কেউ রীতিমতো ভয়ার্ত। কিন্তু কেউই স্পষ্ট বর্ণনা করতে পারেনা সেই ভূতেদের। অশিক্ষিত ভয় নির্জ্ঞানকে কানাঘুষোয় ফুলিয়ে বিশালাকৃতি করে তোলে। একদিন রেভারেন্ড সেই ভূতেদের দেখতে পেলেন। দুই মানবশিশু। দুটি মেয়ে। মেয়ে?…

Read More

রামমোহনঃ আধুনিকের লড়াই

প্রায় দুশো বছর আগে ১৮১৮ সালে প্রকাশিত হয়েছিল কয়েকপৃষ্ঠার একটি ক্ষুদ্র পুস্তিকা ‘সহমরণ বিষয় প্রবর্ত্তক নিবর্ত্তক সম্বাদ’। (এরপর থেকে ‘প্রথম সম্বাদ’ বলে উল্লেখিত)। রচয়িতা রামমোহন রায়। শিক্ষিত বাঙালি সমাজ নারীজাতির অধিকার নিয়ে তখনও উচ্চকিত হয়ে ওঠে নি। সমাজে তখনও বহমান বিধবা নারীকে পুড়িয়ে মারার  শাস্ত্রসম্মত সেই নারকীয় প্রথা –সতীদাহ। ক্ষুদ্র এই পুস্তিকায় রামমোহন রায় স্ত্রীজাতির সবচেয়ে বড় অধিকার নিয়ে লড়াই করেছেন – তা হল বেঁচে থাকার অধিকার। সহমরণ ও অনুমরণ প্রথার নারকীয়তা নিয়ে বর্তমানে কাউকে বুঝিয়ে বলার প্রয়োজনীয়তা নেই। কিন্তু আধুনিকতার সেই ঊষালগ্নে প্রয়োজন ছিল বুঝিয়ে বলার। প্রয়োজন ছিল স্ত্রীজাতির…

Read More

কবিতাযাপনঃ ‘এবার আপনারা যে যার মতো বন্দুক তুলতে পারেন…’

শান্তিনিকেতন আর বোলপুর লাগোয়া তবে দুয়ের মধ্যে ধাতুগত পার্থক্য আছে । শান্তিনিকেতন অভিজাত, আন্তর্জাতিক । বোলপুর নয় । ট্রেন বোলপুর স্টেশনে থামে, তারপর বোলপুরকে পেছনে ফেলে শান্তিনিকেতনের দিকে চলে যাওয়া । তবু বোলপুরে শান্তিনিকেতনের হাওয়া পাক খায় – বিষাদের, সংস্কৃতির, কবিতার । শান্তিনিকেতনের সঙ্গে সাবেকি সংযোগ থাকলে যতটা আলো পাওয়া যায় বোলপুর থেকে উঠে আসা বিষাদ ততটা আলো সবসময় পায় না । বোলপুরকে খুঁজতে হয় তার আত্মপরিচয় – শান্তিনিকেতনকে ছুঁয়ে থাকে, তবে জানে বোলপুর শান্তিনিকেতন নয় । স্টেশনে অবশ্য লেখা থাকে বোলপুর(শান্তিনিকেতন),সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠায় শান্তিনিকেতন   শান্তিনিকেতনই । ছেলেটি বোলপুরের – বিষাদের,…

Read More

কবিতাযাপনঃ জেরক্সওয়ালা

সবাই যে চাকরি পাবে তা তো নয় । তবে সবাইকেই খেতে হবে । কে কীভাবে জোটাবেন তাঁর খাবার তাঁকেই ঠিক করতে হবে তা । তিনি ঠিক করেছিলেন জেরক্স করবেন । জেরক্স করে যা হয় তাতেই চলে যাবে বিধবা মা আর ছেলের । মুর্গি  কাটা সম্ভব হয়নি তাঁর পক্ষে । শেওড়াফুলিতে তখন অনেক মুর্গিওয়ালা । একজনের পর আরেকজন গজিয়ে উঠছেন । খুলছে এস টি ডি আর আই এস ডি বুথ । ফোনে কথা বলার নেশায় আস্তে আস্তে মজে যাচ্ছে পাড়া । পাড়ার মোড়ে মোড়ে বসে পড়ছে্ন মুর্গিওয়ালা । একটা আয়তকার খাঁচা…

Read More

তিন বহিরাগত

(দেবভাষা’র পক্ষে) ৬বি, যতীন দাস রোড, লেক মার্কেট, কলকাতা ২৯। দেবভাষার সাম্প্রতিক ঠিকানা। এ-বছর পয়লা বৈশাখ থেকে। এর আগে ছিল রিজেন্ট প্লেস, রাণিকুঠি। ওটা দেবজ্যোতির বাড়ির ঠিকানা। অর্থাৎ বোঝাই যাচ্ছে দেবভাষার যাকে বলে পার্মানেন্ট অ্যাড্রেস, তা এখনও অব্দি নেই। কোনোদিন যে হবে তা হলফ করে বলা খুব কঠিন। ব্লাড ডোনার অনেকেই। আমরা একজন যে কোনো গ্রুপের ল্যান্ড ডোনার খুঁজছি, জানা থাকলে বলবেন, কৃতজ্ঞ থাকবো। যতদূর জানি, আমি এবং দেবজ্যোতি ( মুখোপাধ্যায় ), সিরিয়াসলি কিছু করতে হবে ভেবে, আজ অব্দি কোনো কাজই করিনি। কবি হতে হবে ভেবে কবিতা লিখিনি। সম্পাদক হতে…

Read More

#ডেটলাইন

চৈত্রে রচিত রোদ্দুর ফেটে বেরিয়ে পড়েছে শিমুলের তুলো। বীজ, ফল বিস্ফোরিত হয়েছে। শাল্মলীসারি এই তমালের নীচে খাঁ-খাঁ টানা মাঠ। পর্ণমোচনের ধ্বনি যেন তুলাচাষির দীর্ঘশ্বাসের মতো পাথর আঁচড়ায়। ব্যাঙ্ক-ব্যবস্থা আর ঋণনীতি অদূরে দাঁড়িয়ে থাকে। মহাজন-দালাল-ফড়ে ব্ল্যাকম্যাজিক চর্চা করে। আরও একটি আত্মহত্যার জন্ম হয়। স্ক্রোল-আপ করতে থাকি। নিউজ ফিড, ইমোজি, স্পনসরড পোস্ট, শপ নাও, ফানি ভিডিও, ঢেঁকুর তোলার ট্যাগড, অ্যাপ্লিকেশনের মাতৃভাণ্ডার। চিকিৎসা শুরুর আগেই মৃত্যু ঘটে যায়। হাসপাতালের ঘরে পোকা ওড়ে ভিজিটিং আওয়ারে। হাতে মাত্র পড়ে থাকে মিনিট খানেক যোগাযোগ। রোগীদের পথ্য নেই, ওষুধেরও ডেট এক্সপায়ার্ড। আমি লিখি না। ট্রোলসভ্যতা আমাকে লুডো…

Read More

সংকেত

দুনিয়া যখন দশদিন ধরে টানা কেঁপে উঠছে – সেই সময় এইরকম ভুলভ্রান্তি করা কি আদৌ মাফযোগ্য? রতন বারুই রোজ সকালে যা করে, আজও তা-ই করল, প্রথমে জানলাটা ফাঁক করে চোরের মত দোকানটার দিকে ঠায় তাকিয়ে থাকল, তারপর ভেতর ভেতর টেনশানে ক্ষয়ে গেল। গতরাতে ঝড়বৃষ্টি হয়েছিল। দোকানটার সাইনবোর্ড তাতে হেলে গেলেও বৃষ্টিজলে ধুয়ে খানিকটা সাফসুতরো হয়েছে। ফলে হলুদের উপর লাল রঙ দিয়ে ‘মহম্মদ আলি, এল এল বি’ লেখাটা প্রায় নতুনের মত জ্বলজ্বল করছে। রতন বারুই আর একবার চারপাশটা দেখে নিতে চাইল। কোথাও কোন সন্দেহজনক কিছু ঘটেছে কিনা তা তার জেনে রাখা…

Read More

গন্তব্য এখন উরুগুয়াই

প্লাতা নদী – ছলাৎ ছলাৎ জলের শব্দে মাতোয়ারা চারিদিক। জলের আওয়াজ কোথা থেকে শুরু, কোথায় শেষ কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। দৃশ্যের পর দৃশ্য জুড়ে ধু ধু অন্ধকার। অন্ধকারের অন্তরঙ্গ থেকে ফুটে উঠেছে রঙ বেরঙের কতগুলি আলোর বিন্দু। কখনও তা উজ্জ্বল আবার কখনও ঝাপসা। অনেকটা বেশি পাওয়ারের চশমা পড়লে যেমন দেখতে পাই। প্লাতা নদীর ধার বরাবর রয়েছে কাঠের রাস্তা। আমার পা ফেলার আওয়াজ ছলাৎছলাৎ শব্দের সাথে মিশে যাচ্ছে। এক জায়গায় দাঁড়িয়ে , চোখ গোল্লা গোল্লা পাকিয়ে, ঈষৎ ঝুঁকে, দেখে নিলাম, কাঠের তক্তার নীচে কি আছে ? যদি ভেঙ্গে যায় কোথায় গিয়ে…

Read More

এক জানলা, একেক বিভুঁই

ঝোড়ো হাওয়া, বোমাবর্ষণ, মুক্তকচ্ছ বিঘ্নরূপক টম রেওয়ার্থকে (Tom Raworth) কয়েক বছর আগে প্রথম দেখি সিনসিন্যাটিতে। উনি পড়তে এসেছিলেন। সে সময়ে ওঁর দোসর বা সমসাময়িক ও সমাদর্শের কবি জেরেমি প্রিন সম্বন্ধেই আমার আগ্রহ ছিলো অপেক্ষাতর প্রবল। তবু রেওয়ার্থ টেনেছিলেন। পাঠাসরে গিয়ে টের পেলাম ওঁর কবিতার ভক্তের সংখ্যা এই মাঝারি সংস্কৃতির শহরেও বলবার মতো। কোনো কথা হয়নি, আলাপ হয়নি, পাঠের পুরো সময়টা থাকতেও পারিনি। সেদিন ‘ভুলেভরা’ বা ‘Errory’এই কবিতাটা পড়েছিলেন রেওয়ার্থ। আর পড়ার সময় মন্ত্রমুগ্ধ শোতৃবৃন্দের মধ্যে এক ইঞ্চিও নড়াচড়া হয়নি। আমি একেবারে পেছনের সারিতে দাঁড়িয়ে ছিলাম। টম রেওয়ার্থের পাঠের দ্রুতিটা ছিলো…

Read More