শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

আমেরিকা এক হিমায়িত চিৎকার

২০০৪ সালের কলকাতা বইমেলার সময় আমার বয়স ২৫, ছটফটে, রক্তে স্বভাবকবিত্ব, যেকোনও কথায় মিলিয়ে দিতে পারি অন্ত্যমিল, যেমনটা হয় বা হত নয়ের দশক ও তার অব্যবহিত পরের কফিহাউসতুতো কবিদের, একশ বছর আগেকার রিলকে কে নকল করে কবিতার আদর্শ স্থির করা, দূর মফস্বলের গ্রন্থাগারিক কবি, শহরের করণিক কবি, অধ্যাপক কবি কেউই আসলে কবিতার ২১ শতকের বিশ্বের সন্ধান দিতে পারছিল না, যদিও তাঁরা সকলেই সেই শতকের বাসিন্দা (নাকি নন, তাঁরা আরও বেশি করে ব্রত পুজো পার্বণ হাতে তাগা তাবিজ মা দিয়েছে আংটি)। বহু পরে বুঝেছি পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি আসলে শুধুই প্রাচীনে আস্থা রাখে, স্বর্ণযুগ ইত্যাদি। ২০০৪ এর বইমেলায় ব্যক্তি আমার জীবন থেকে এই স্বর্ণজুজু চলে যায়। ২০০২ সাল থেকে শুরু হওয়া ভাঙনে এক সজোর হাতুড়ি মারেন চিলে (Chile) থেকে আসা কবি রাউল সুরিতা (Raúl Zurita)আমার প্রথম দোভাষীর কাজ। তিনি আসার আগে তাঁর সম্পর্কে সামান্য পড়তে পেরেছি তখনকার ডায়াল আপ ইন্টারনেটে। কিন্তু তখনও আমার খেলা যখন ছিল তোমার সনে তখন কে তুমি তা কে জানত অবস্থা। সেই সময় থেকে ধীর লয়ে শুরু হয় তাঁকে জানা, দেখতে পাওয়া তাঁর আমাদের সময়ের দান্তে হয়ে ওঠা এমনকি গত বছর নোবেল পুরস্কারে মনোনীত হওয়া। আমার মত অকিঞ্চিতকর মানুষের প্রতিটা ইমেইল এর জবাব দেওয়া, ভারতে এলে দেখা করা, এবং সমস্ত বই উপহার দেওয়া সে সব তো আছেই। 

কী শিখলাম তাঁর কাছে? দেশের ভূগোল কে ব্যবহার করতে শেখা। প্রকৃতির কাছে না গিয়ে ভূদৃশ্যের সিনেমার মত ব্যবহার। পৃথিবীকে এক বিরাট ক্যানভাস হিসেবে দেখা। তিনি হেলিকপ্টারের ধোঁয়া দিয়ে নিউ ইয়র্কের আকাশে লিখেছেন কবিতা। তাঁর আন্দেস পর্বতমালার স্তবক ভাস্কর্য করা হবে সেই পাহাড়েরই গায়ে। তাঁরও প্রতিটা বই আসলে একটি দীর্ঘ কবিতা, আবার তাকে টুকরো করেও পড়া যায়। তিনি গোটা দেশের ভূদৃশ্য কে ব্যবহার করেছেন সমসাময়িক ইতিহাসের প্রেক্ষিতে। এসেছে পিনোচেতের সময়। রাজনৈতিক কবিতা লেখার এই ধরণ আমাদের মত পাঠকদের কাছে অপরিচিত ছিল। তাঁর কবিতা চিলের মানুষের কাছে তাঁকে অপরিহার্য করে তুলেছে বেদনার দিনে। আমাদের মনে রাখতে হবে পশ্চিমবাংলার মত আবেগ সর্বস্ব কবিতা আর লাতিন আমেরিকায় লেখা হয় না। নির্মাণ দক্ষতা এবং কবিতার ভাবনা জগতের প্রতিফলন সেখানে জরুরি। এবং এ কথাও মনে রাখি বারবার যে রাউল সুরিতাও সেই মেদুসারিও সংকলনের কবি। 

আর এইভাবেই গত চল্লিশ বছরে কবিতার যে পরিবর্তন এবং সেই বিষয়ে এই গদ্যগুলি লিখে ফেলা হল, সেখানে মূলত এস্পানিওলভাষী আমেরিকার কথা লিখেছি, কিন্তু সেখানে এক অন্য যোগের কথা না লিখলে এই লেখা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। তিনিও পেশায় এস্পানিওল ভাষাবিদ। এবং তিনি মার্কিন দেশের এক প্রধান কবি (যদিও মার্কিন দেশ আর্যনীল মুখোপাধ্যায়ের এলাকা, কিন্তু এই কবিকে নিয়ে কিছু লিখলে তিনি আমাকে মার্জনা করবেন আশা করি), ২০১৯ সালে কবিতার জন্য পুলিৎজার পুরস্কার পান। তিনি ফরেস্ট গ্যান্ডার (Forrest Gander) তাঁর কথা এই গদ্যমালার মধ্যে আসা দরকার কারণ তিনি এখানে আলোচিত প্রায় সমস্ত কবিরই ইংরেজি অনুবাদক (দাবিদ উয়ের্তা বাদে) এবং সেই অনুবাদেই কোরাল ব্রাচো বা রাউল সুরিতা মার্কিন দেশে তথা ইংরেজিভাষী অঞ্চলে পরিচিত হয়েছেন। ফরেস্ট নিজে ইকোপোয়েট্রি বা পরিবেশবাদী কবিতার এক প্রধান রূপকার। পরিবেশবাদী কবিতা কিন্তু প্রকৃতির কবিতা নয়। বরং এক সন্ধান আমাদের আদি পৃথিবীর।  আমাদের ফেলে আসা কিছু চিহ্ন। এবং এই কবিতাতেও নির্মাণ খুব জরুরি একটা দিক। আবেগ নয়। তিনি লাতিন আমেরিকার কবিতায় তাঁর নিজের কবিতার রসদ খুঁজে বেড়ান, আবিষ্কার করেন কবিদের। এবং মজার বিষয় হল এখন তাঁর কবিতাভাবনা উশকে দিচ্ছে আমাদের প্রজন্মের কবিদের। তাঁরা বেরিয়ে পড়ছেন নতুন কবিতার সন্ধানে। 

আগেই বলেছি আমেরিকা মহাদেশের কবিতা নতুন আঙ্গিককে ধরতে চায়। ফলত কবিতার আবেগ-পাঠকের কাছে এই কবিতা অনেক সময় দুর্বোধ্য ঠেকে। অনেকেই ছিটকে যান। এই যে কবিতার ভাবজগত এখানে কবিদের মুখোমুখি কবিরা বড়জোর কিছু সাহিত্যের শিক্ষক। কবিতার সঙ্গে অন্য পাঠকের যোগ কম। আমাদের ভাষাতেও প্রায় তাই হলেও এখনও আমরা বিশ্বাস করতে চাই না। এই যে কবিতার বিশেষ পাঠক তা কবিতার পরীক্ষা সম্ভাবনা ও উদ্ভাবন সম্ভাবনাকে উশকে দিয়েছে। এখানে এসে ঢুকেছে নানা রকমের শিল্পমাধ্যমের মিশ্রণ। নানা জ্ঞানশাখার মিশ্রণ। তাই যে পাঠক শুধু আবেগ খোঁজেন কবিতায় তিনি এখানে রস পাবেন না। “সনাতন” কবিতার পাঠককে এখানে বেশ পরিশ্রম করতে হবে অভ্যাস বদলাতে। অনেকেই ভুল করেন প্রথমে, আমি অতি দীক্ষিত বাঙালি পাঠককেও দেখেছি ঠকে যেতে এই কবিতার সামনে। কারণ তিনি কবিতা চর্চা বলতে “স্বাভাবিক” কবিতার কথা ভেবেছেন। তিনি অনেক ২০ শতকীয় পোস্ট মডার্ন তাত্ত্বিকের মধ্যে অনেক বেশি কাব্যিকতা খুঁজে পেয়েছেন। কিন্তু তিনি এইটা বুঝতে পারেননি যে তাঁর পরিচিত “কাব্যিকতার” জগৎ একুশ শতকের আমেরিকা মহাদেশে নেই। 

কিছু লিংক এখানে দেওয়া রইল। উৎসাহী পাঠক পড়ে দেখবেন আশা করি। 
http://www.cervantesvirtual.com/obra-visor/an-introduction-to-zurita/html/984cabe1-6deb-4815-b43f-0e99049cb081_2.html
https://www.poetryfoundation.org/podcasts/76153/raul-zurita-international-poets-in-conversation
http://jacketmagazine.com/40/r-zurita-rb-gander.shtml
https://www.poetryfoundation.org/poets/forrest-gander
https://www.youtube.com/watch?v=uUxRD4BZPtw&t=1s
https://www.youtube.com/watch?v=Ziw8HPOtIbg&t=519s

Facebook Comments

Hits: 254

Related posts

Leave a Comment