অনিমিখ পাত্র

পিনা পিক্কোলো’র কবিতা

অনুবাদঃ অনিমিখ পাত্র

কবি পরিচিতিঃ  গুরুত্বপূর্ণ দ্বিভাষিক (ইতালিয়ান ও ইংরাজি) কবি-অনুবাদক-সম্পাদক-সংগঠক পিনা পিক্কোলোর জন্ম ১৯৫৬। তাঁর পরিবারে রয়েছে বারংবার অভিবাসনের ইতিহাস। উচ্চশিক্ষা আমেরিকায়, ১৯৭০-এর উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছাপ ফেলে তাঁর চেতনায়। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়েছেন ইতালীয় ভাষাসাহিত্য। দারিও ফো’র ওপরে করেছেন মৌলিক গবেষণা। ২০০৩ সাল থেকে পাকাপাকিভাবে ইতালির বাসিন্দা। তাঁর কাব্যসংকলন I canti dell’Interregno প্রকাশিত হয়েছে ২০১৮য়। এছাড়াও তাঁর কবিতা নানান আন্তর্জাতিক সাহিত্যপত্রে এবং সংকলনগ্রন্থে রকাশিত হয়েছে। তিনি প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক The Dreaming Machine এবং La Macchina Sognante নামক দুই যমজ সাহিত্যজার্নালের। 

কবিতা তাঁর কাছে একইসঙ্গে ব্যক্তিগত ও সামাজিক প্রকাশ। ভীষণরকম রাজনৈতিক এই কবি বিশ্বাস করেন বল্ডউইন-এর এই উক্তিটি “Artist are here to disturb the peace”। একইসঙ্গে বিশ্বাস করেন সামাজিক প্রসঙ্গে কবি যদি যথেষ্ট গভীরভাবে আলোড়িত না হন তাহলে সেই কবিতা হয়ে দাঁড়াবে ভাষার খেলা মাত্র।  

নিজেকে বলেন এক সাংস্কৃতিক কর্মী যিনি নিরলস চেষ্টা করে যাচ্ছেন সাহিত্যের আন্তর্জাতিক আদানপ্রদানের মাধ্যমে একটা সচেতন ও উন্মুক্ত জায়গা তৈরি করতে। 

তাঁর কবিতায় সমসাময়িক ঘটনাবলীর গায়ে লেগে যায় মিথ কিংবা দৈনন্দিনের ছোট্ট ঘটনাও দৃষ্টিপাতের বিশেষত্বে হয়ে ওঠে রাজনৈতিক। পিনা’র ১৯৮১-২০২০ সময়পর্বে লেখা কবিতার একটি নির্বাচিত পান্ডুলিপি (প্রকাশিতব্য) ‘AVATARS FROM THE BORDERLANDS’ থেকে নানান সময়খন্ডে লেখা ৮টি কবিতা অনূদিত হল। যা শুরু হচ্ছে আন্তোনিও গ্রামশি’র উদ্ধৃতি দিয়ে।  

“সংকট এইখানেই যে পুরাতন মারা যাচ্ছে আর নতুন জন্মাতে পারছে না; এই বিরতিকালেই অস্বাস্থ্যকর লক্ষণগুলি বৈচিত্র্য নিয়ে ফুটে ওঠে”
– আন্তনিও গ্রামশি

 

ধিকিধিকি আগুন আর জাদুমন্ত্রের দিনগুলি

ধিকিধিকি আগুন আর জাদুমন্ত্রের দিনগুলিঃ 
জাংশানে এসে ওঠানো যায় না পা
যখন তুমি শোনো পাখিরা কিচিরিমিচির করছে
আর গিরিগিটিরা আঠার মতো লেগে আছে
বাষ্প ওঠা পাথরের গায়ে
 

কিছুদূরে বজ্রবিদ্যুতের দিন
আর সৌরকলঙ্ক ইশারা দেয়
মহাদেশীয় প্লেটগুলি সরে যাওয়ার উজ্জ্বল গতিপ্রবাহের দিকে
যখন স্টাফড্‌ আর ক্ষুধার্তরা বসে অপেক্ষা করছে
কখন আঘাত হানবে ড্রোন
আর আত্মার ভেতর
পৌঁছে দেবে ভয়

 

যারা অবিশ্বাসকে বন্ধক দিতে চায় না তাদের প্রতি প্রশংসায়

এমন নয় যে ওরা কখনও আমাদের জিজ্ঞেস করেছিল
যে আমরা রাজি কিনা
আমাদের অবিশ্বাসকে বন্ধক দিতে 
তারা ধরেই নিয়েছিল 
আমরা এতদিন ধরে এরকম করে আসছি যে
এটাই হয়ে উঠেছে আমাদের দ্বিতীয় ত্বক

 

এমন নয় যে ওরা আমাদের জিজ্ঞেস করেছিল
আমাদের কোনো অন্য ভাবনা আছে কিনা
আমাদের নিজেদের সম্পর্কে আর সন্তানদের সম্পর্কে
আর আমাদের সাত প্রজন্ম
যারা রয়ে গেছে 
আমাদের আঁশময় পিউপার মধ্যে
আমাদের থুতুর মোড়কে
আর তাদেরও
কখনও মুক্ত হয়নি আমাদের ডানা
এক নিথরজন্মের খিঁচুনিময় যন্ত্রণায় 
অভিশপ্ত হয়ে 
রয়ে গেছে

 

আবিষ্কারের জননী

যখন তিনি বসেছিলেন অসম্পূর্ণ হয়ে
সেই ডুমুর গাছটার নীচে
যা তার বন্ধ্যাত্বের জন্য
অযৌক্তিকভাবেই অভিশপ্ত
মা কুয়োর দিকে তাকিয়ে বসেছিলেন
জল দুর্গন্ধ ছাড়ছিল
আর জল তুলবার পুলি ক্যাঁচকোঁচ আওয়াজ করছিল
খুব একটা ভালো ছিল না এই নির্বাচন
তখন তাঁর মনে পড়ল 
তাঁর হাতে ধরা লাঠির ক্ষমতা
তাঁর মনে পড়ল যে তুমি 
জলকে আঘাত করতে পারো
যেমনভাবে তুমি আঘাত করতে পারো তেলকে
যেমনভাবে তুমি আঘাত করতে পারো সোনাকে
এবং সেই ফোঁটাগুলোর দ্বারা পরিচালিত হয়ে
যা তাঁর কোষগুলিকে পুষ্ট করেছে
মহিলাদের মাথায় বসানো জলের কলসীর স্মৃতিতে
অনেক বছর আগে যে জল ভেঙেছিল
তার শরীরের ভেতরে
আর যা গড়িয়ে গিয়েছিল তাঁর পুলকের সময়
তিনি প্রয়োজনীয়তাকে পুনরাবিষ্কার করতে বসলেন

 

আদিম স্বপ্ন

গাঢ় সবুজের।
পরিশ্রুত আলোয়
তুলে ধরছে তার বহুমূল্য অন্তঃস্থল
 

নরম উন্মোচন
রাত্রি আবরণীর ভেতর
যখন অরণ্য ধুয়ে যাচ্ছে 
অযুত নিভে যাওয়া নক্ষত্রের আলোয়
ঝুলে আছে
তাদের ধুলো
সময়ের মাকড়শা-জালে 
 

তদন্ত করে দেখছে সেই স্তর
যেখানে কোনো ধনরত্ন
লুকিয়ে নেই
এবং যেখানে মথেরা
বাসা বানায়
স্মৃতির অন্ধ দাগগুলোয়
 

সেই স্তরটায়
যেখানে তোমার অল্পবয়সী সত্তা
লুকিয়ে আরাম করছে
তোমার পরবর্তী চালকে
আমোদিত ও হতচকিত করে তুলছে
 

এই বাহ্যিক শান্তভাবের দ্বারা
নিজেকে বোকা বনে যেতে দিও না
তলায় তলায়-
একটা ঘূর্ণির নীরব পাক
রাস্তা খুঁড়ে ঢুকে পড়ছে
বাস্তবতার ভেতর 
 

এই স্বপ্নসময়ের বাইরে
একটা ফ্যামিলি ট্রির
ছড়িয়ে থাকা শাখায় শাখায়
 

হুশ করে উঠে আসছে
অনিশ্চয়ের কুয়াশা
সরে সরে যাওয়া মহাদেশগুলির
থুতুর মধ্যে শনাক্ত হওয়া
গহীন ডিএনএ
যার সাঁকো নড়বড় করছে
ঢেউয়ের আক্রমণে
 

তবু অরণ্যের গভীরে
দেখা যাচ্ছে বিশ্রামরত ফার্ন
দৃষ্টির বেদির ওপরে
স্পটলাইটের মতো আলো এসে পড়েছে
তার গায়ে 

 

এই সময়ের হাইকু

আমরা এই সময়টাতে থাকি
যেন এক পালকফোলানো পাখি
যে বসে আছে সবচেয়ে বাইরের ডালটায়
পালানোর দ্রুততম রাস্তাটা খুঁজছে
-উড়ে যাবার জন্য ওই প্রস্তুত 

 

আলেপ্পোর জন্য* 

এপ্রিল সকলের জন্যই নিষ্ঠুরতম মাস
কাকটা কা কা করে বলেছিল
যখন সে বসেছিল শোকার্ত
ভেঙে পড়া দেওয়ালটার কাছে
-ওরা বের করে এনেছিল
দশটা কচি দেহ
নিয়ে গিয়েছিল শেষ শিশুচিকিৎসকের কাছে
যে শহর ছেড়ে যায়নি
 

বহুকাল আগে
ঠিক এই দেওয়ালগুলোর কাছেই
ছিল একটা বন্দর
যেখানে জোনাসকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল
একটা জেদি বুড়ো তিমি** 
যে তাকে দৈববাণীর সক্ষমতা থেকে
পালিয়ে যেতে দেয়নি
 

তোমার সহনাগরিকদের ওপর
যে অশুভ নেমে আসছে তার থেকে
তুমি মুখ ঘুরিয়ে নিতে পারো না
মাটিতে, বাতাসে কিংবা সাগরে
 

মুখ ঘুরিয়ে নিতে পারো না
কা কা করে বলল কাকটা 
যখন সে ঠুকরে নিচ্ছিল 
ঔদাসীন্য ও ছলনার নুন
যাতে তার কন্ঠনালী
কান্না হয়ে যায় 

 

*আলেপ্পো হলো সিরিয়ার একটি যুদ্ধবিদ্ধস্ত শহর।

** ওল্ড টেস্টামেন্টের গল্প। জোনাসকে ঈশ্বর তাঁর বাণী প্রচারক বা প্রফেট হওয়ার দায়িত্ব দেন। জোনাস তাকে অগ্রাহ্য করে সমুদ্রযাত্রায় বেরিয়ে পড়ে। তখন সমুদ্রে প্রবল ঝড় ওঠে, মাঝিমাল্লারা জানতে পারেন যে এই বিপদ জোনাসের কারণেই। জোনাস তাকে সমুদ্রে ফেলে দিতে বলে, অন্যান্যরা তা-ই করেন। একটি বিশাল তিমি জোনাসকে গিলে নেয় এবং তার পেটের ভেতর তিনদিন থাকার পর তিমিটি জোনাসকে উগরে দেয়। প্রাণে বেঁচে যাওয়ার জন্য জোনাস ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানিয়ে তাঁর মিশনটি গ্রহণ করে। 

 

কন্টকিত উপহার

এক বন্ধু ফোন করেছিল
কারণ নিজের তিক্ততা নিয়ে সে
একা থাকতে চায়নি
টেলিফোনের তার
আমাকে দিয়েছিল এক কন্টকিত উপহার
তার ত্বক শক্ত আর কাঁটাময়
কিন্তু অভ্যন্তরটা ভর্তি
নরম শাঁস আর বীজে
সম্ভাবনাময় ক্যাকটাস
যে বেড়ে উঠতে পারে ঊষর জমিতে
সব অগ্রাহ্য করে। 

 

পোকার প্রেম*

বুকের এতো কাছে নিয়ে তুমি খেলো তোমার তাসগুলো 
যে আমি ধরতে পারি না তোমার হৃদয়
জমে গেছে, তা থেকে রক্তপাত হচ্ছে নাকি ওটা আসলে নেই-ই।
 

আমি শপথ করে বলছি আমি তোমাকে বানাবো না
কোনো শুভ্র বীর নাইট
যার বর্মে প্রতিফলিত হবে
সুদূর ইউটোপিয়া 
 

আমি শপথ করছি আমার কান ভরে ফেলব মোম দিয়ে
যাতে তোমার ছেলেমানুষের মতো হাসি আমাকে শুনতে না হয়
এবং তাকে অনুসরণ করে পৌঁছে যেতে না হয় দুধ আর মধুর দেশে
 

আমি নিশ্চিত আমি দেখব তোমার উদ্ধত রূপ
যখন তুমি সমালোচনা করবে পিতা ঈশ্বরের মতো,
কিন্তু, তবুও, আমি তোমার দিকে তাকাব
ঋষির মতো
যখন তুমি দুঃখ করবে আবেগ চলে যাওয়ার জন্য
 

সুতরাং এখন, আমি বসে আছি
আমার এই মেঝের পাটাতনে
আমার চতুর্দিকে ছুটির দিনের টুকরোটাকরা 
অবাক হয়ে ভাবছি, তুমি ধোঁকা দিচ্ছ
নাকি সত্যিই ভালো একহাত দান পেয়েছ! 

 

*পোকার একপ্রকার তাসের খেলা। 

Facebook Comments

Hits: 710

Related posts

5 Thoughts to “পিনা পিক্কোলো’র কবিতা”

  1. রাণা রায়চৌধুরী

    চমৎকার অনুবাদ। সবচেয়ে ভালো লাগলো’আবিষ্কারের জননী’! এছাড়া ‘পোকার প্রেম’ ও ‘আলেপ্পোর জন্য’ও খুব ভালো লাগলো।
    অনুবাদক হিসেবে তোমাকে ধন্যবাদ। নাহলে এই কবিকে পড়াই হতো না।
    একবার পাঠের প্রতিক্রিয়া দিলাম। দ্বিতীয় বার পড়ব।

  2. আমরা এই সময়টাতে থাকি
    যেন এক পালকফোলানো পাখি
    যে বসে আছে সবচেয়ে বাইরের ডালটায়
    পালানোর দ্রুততম রাস্তাটা খুঁজছে
    -উড়ে যাবার জন্য ওই প্রস্তুত

    কবিতাটা নাড়িয়ে দিয়ে গেলো। এমন কাজ চলতে থাকুক বাংলা সাহিত্যে, ভাষা সমৃদ্ধ হবে।

  3. সীমিতা মুখোপাধ্যায়

    চমৎকার কাজ করেছ, অনিমিখ। তোমার জন্য এই কবিকে জানতে পারলাম। সবচেয়ে ভালো লাগল ‘আবিষ্কারের জননী’।

  4. শৈলেন চৌনী

    খুব ভালো লাগলো।অনুবাদ বলে মনে হচ্ছিল না। এভাবে একজনের পরিচিতি পেলাম, একটা ধারণা পেলাম পিনা পিক্কালোর কবিতা সম্বন্ধে। থ্যাংকস।

  5. Jhelum Tribedi

    The translations are excellent and they have adequately conveyed the spirit of the poems. It is only translation that can transcend the language barrier and help spread the literary creations of one particular vernacular to an entirely different readership.

    I feel it is high time Bengali literature be translated in different languages too, or else none would ever know what we are writing, about whom we are writing. Rabindranath Tagore had felt the necessity of translation long back. We need to focus more on the same….

Leave a Comment