অরিন্দম ভূঞ্যা

অরিন্দম ভূঞ্যা’র কবিতাগুচ্ছ

ঠিকানা হারিয়ে যায়

এসব গলিপথ মনের মধ্যে কোথাও ছিল
যখন শৈশবে বুকভর্তি শ্বাস নিতাম
খুলে যেত হাওয়ার এক একটি মাঠ
ক্রমশ মাঠের ধারে ঘর বসালাম
ঘরের ফাঁকে ফাঁকে প্যাঁচ খুলে ছড়িয়ে দিলাম শিরা ও ধমনী
তার ওপর আকাশের সরু করে কাটা একফালি দিলাম সেঁটে
এইভাবে আমাদের নতুন একটি ঠিকানা হল
কিন্তু, ঠিকানা খুঁজতে গিয়ে মানুষ এবং কুকুরেরা
দূর সেই অচিন শহরে গেল হারিয়ে
উদ্ভ্রান্তের মতো ঘুরল এদিক ওদিক,
এক সন্ধ্যায়, গলির ভেতর ঠিকানা খোঁজা মানুষের সঙ্গে
আশ্রয় খোঁজা একটি কুকুরের দেখা হয়ে গেল,
সেই চোখ, সেই দুজনের থমকে যাওয়া,
তারা কি পরস্পরকে তাড়াবে? নাকি বন্ধু হয়ে যাবে?
দুজনেরই চোখ সন্ধ্যার আকাশে জ্বলছে
মনে পড়ছে কতকাল আগে পিঠে তীর-ধনুক নিয়ে
ওরা দু-বন্ধু সারা আকাশ জুড়ে শিকারে বেরোতো

বুকে ব্যথা

পথের একটি কাঁটাকে আপন ভেবে তুলে নিয়েছি
এখন ভাবছি কাঁটাটি ফেলবো কোথায়?
ঘাসেরা জোড়হাত করে বলছে
‘ওই গুপ্ত শত্রুকে আমাদের ওপর ছুঁড়োনা’
ছোট বড়ো ঢিবি পাথরেরা মাথা ঠুকে কাঁদছে, আর বলছে
‘আমরা অভিশপ্ত দৈত্য এবং রাজকুমার, আমাদের দুঃখের জীবন
আর কণ্টকিত করোনা’
ত্রিজগতে কেউ কাঁটাকে গ্রহণ করতে রাজি হল না
রাস্তা থেকে যেমন কুকুর ছানাদের তুলে আনি
ঠিক সেইভাবে কাঁটাটিকে বুকের মধ্যে দিলাম রেখে

এত সুখের ভেতর চিনচিনে ব্যথা হয়ে
সে আমাকে কত যে শান্তি দেয়!
ডাক্তার সেসব ধরতেও পারে না

খেলা

একটি পোকা পৃথিবীতে পা ফস্কে উল্টে গেছে
আট পা ওপরের দিকে করে মেঝের ওপর ফর ফর ঘুরছে
হাতজড়ো করে আকাশকে বলছে এই হীন কীট কে মার্জনা করো|
আকাশের রং এক তলা ছাদের মত পুট্টি করা সাদা
দেবতারা তার ওপরের তলায় থাকেন, তারা অফিস
এবং রান্নার কাজে খুব ব্যাস্ত, এসব ডাক সহজে
কানে পৌঁছয় না, তবে অবোধ শিশু দেবতাদের খেলা
বড় ভয়ঙ্কর, তারা টোকা দিয়ে জীবন ফিরিয়ে দিতে পারে
আবার কলমদানি দিয়ে পিষে ফেলতে পারে মেঝেতে

মেদিনীপুর

এটা ঠিক কোথায়, জীবনের কোন বাঁকে পৌঁছে দিলে ড্রাইভার?
আলো-আঁধারির ভেতর কিছুই তো ঠিকমত দেখা যায় না,
সেই কোন পথের শুরুতে ভিড় ঠেলে আমরা এই বাসে উঠেছিলাম
তারপর একটা সিটের জন্য লড়তে লড়তে
আস্ত এক বসন্তের শালবন পেরিয়ে এসেছি
এখন আর নিত্যযাত্রী নই,
ভাবো, রোদে ঘামে পুড়ে যাওয়া বুনো শাল পাতা
লতাজি’র হালকা সুরে ভেসে, সন্ধের মুখে, শহরে ঢুকে পড়েছে
আর দেখো কিভাবে মুহূর্তে এই গুমোট শহর
নিয়ন হয়ে উঠেছে জ্বলে, ফেটে পড়েছে ফোয়ারায়, ব্যাপ্টিস্ট চার্চের
লাল ক্রস এখন কত উজ্জীবিত, সমুদ্রের চাপা কল্লোল
জেগে উঠছে ক্রমশ, একটু ধীরে চালাও ড্রাইভার
সামান্য কয়েকটি নক্ষত্রপুঞ্জের এই সন্ধে
সমুদ্র চলকে গেলে কি হবে, তুমি জানো না

ভ্রমর

তোমার ক্লান্ত দুটি চোখ, ঘর্মাক্ত গাল, আর ঝুলে পড়া স্তনের সঙ্গে
কোনও ফলেরই এখন সাযুজ্য নেই
তবু মৌমাছির দল তোমার দিকে মাতাল হয়ে উড়ে আসে
তুমি তাদের সামনে কিছু মৃত ফল সাজিয়ে রেখে ভোলাও
আমরা যারা গত জন্মে তোমার চতুর্দিকে উড়ে-উড়ে তোমাকে পাইনি
এ জন্মে তারা গোল হয়ে ঘিরে ফল কিনতে দাঁড়িয়েছি
দাম কমাবার ছলে তোমার সঙ্গে একটু গল্প করছি
মনেপড়ে গত জন্মে তুমি ছিলে রাজকুমারী, আমি তোমার গোপন প্রেমিক
এজন্মে তুমি ফল-ওয়ালি হয়েছ, আমি কোন বহুদূরের কৃপণ মাস্টার

তবু দেখো আমাদের মাঝখানে কিরকম
আপেল বনের সুবাস বইছে

 

শূন্য

জলের ভেতর আকাশ দেখছিলাম
সেই আকাশ থেকে রুপোর একটি মাছ
বুকের মধ্যে ঢুকে পড়েছে
তারপর থেকে জল দেখলেই ছটফট করে
দিনের বেলা তাকে বাস ট্রেন ও টোটোর হর্ন শুনিয়ে শান্ত রাখি
কিন্তু রাত্রির নির্জনতা যখন বাড়ে
তাকে আর আটকে রাখা যায় না, ভেসে ওঠে
আর আকাশপ্রমাণ বাবলস ছাড়ে

এক একটি বাবলস ফেটে তৈরি হয় শূন্যের কবিতা

ডুব

উত্তেজনায় কাঁপছে জল, কাঁপছে জলের আকাশ, কাঁপছে ডানা

এসময় তিনি বললেন
‘লক্ষ্যবস্তু ছুঁতে চাইলে মনকে আরো শান্ত হতে হবে’
এই শুনে একটি ঝুঁকে-পড়া ডালে মাছরাঙা স্থির হয়ে বসল
‘কী দেখছো মাছরাঙা?’ এবার তিনি জিজ্ঞাসা করলেন,
-শান্ত জল, শান্ত আকাশ
‘মূর্খ শিকারি, দৃষ্টিকে আরো গভীরে নিয়ে যাও, বলো কী দেখছ’?
-নীল আকাশের ভেতর সুদর্শন চক্র, চোখ ঝলসে যাচ্ছে,
‘দেখো দেখো, আরো ভালো করে দেখো মাছরাঙা, মাছের চোখ দেখতে পাচ্ছ? ‘
-আহা, কত ছোট ছোট রুপোলি অক্ষর!
-কী অপূর্ব জলের কবিতা
-ভাসছে, আবার ডুবে যাচ্ছে

Facebook Comments

Hits: 329

Related posts

Leave a Comment