হিয়া মুখোপাধ্যায়

হিয়া মুখোপাধ্যায়ের কবিতাগুচ্ছ

মন্টানা হোমস্টে

১.
সরলরেখার মত দিনগুলো কাটছে৷ অনুত্তেজক। অনুশোচনাহীন। মাঝেমধ্যে টুপটাপ রক্তপাত। সেটুকু অভিপ্রেত। বাকিটা ঘুমঘুম কমফর্টার। রোদে জড়ানো ফার্নে বিকেলের ছায়া দোলে। মৃদু পোর্সিলিনের নীচে বসে ছড়া গাঁথার দিন এসব। শিস দিতে দিতে টি এস্টেটের আলোগুলো একে একে নিভিয়ে দেওয়ার দিন। আপাতত সব ঠান্ডা। দু একবার শিরশিরে হাওয়া দিলে শুধু সবার অলক্ষ্যে ট্যাবলেটের ভাষায় তুমি জানি কাকে ডেকে উঠছো।

 

২.
আবার এসেছো তুমি বিষণ্ণ গ্রীলের পাশে। অতর্কিতে আবার দাঁড়িয়েছো হা হা করা খাদের পাঁচিলে। হাওয়ায় পাইন দুলছে। নিভু নিভু শ্রমিক কলোনী। দূরদূরান্ত অব্দি কেউ নেই, শুধু একা তুমি। ক্লাউড ট্রটিং এর মরসুমে উইলো গাছগুলি জ্যান্ত হয়ে উঠছে আবার। পাতা উড়ছে ফরফর আর তোমার কানে কানে চেরিফুলের মত কেউ ফিসফিস করে উঠছে ‘ঝাঁপ দাও! ঝাঁপ! ‘

 

৩.
গুম্ফার দেওয়াল জুড়ে এত এত করুণ ডিসেম্বর জড় হয়ে আছে এখানে না এলে টেরই পেতেনা তুমি। ফ্রেস্কোগুচ্ছ থেকে সারি সারি নাপাম খসে পড়ে। আপনি কাকে খুঁজছেন এখানে?- জিজ্ঞাসা করে একজন মাত্র বৌদ্ধ ভিক্ষু সন্ধ্যের ঠিক মুখে অনায়াসে ইউক্যালিপটাসের ঝোপ এড়িয়ে তোমার ভিতরের নৈশব্দ্যে ঢুকে পড়লেন। হাসিমুখে এখানে না এলে তুমি জানতেই পারতে না নৈশব্দের ভিতরে এতরকমের চিৎকার জমে থাকে।

 

৪.

একে অন্যের বোতামগুলো খুলতে খুলতে ওরা এখানে এসেছিল। তখন কুয়াশা। তিস্তা ব্যারেজ জুড়ে ঘন হচ্ছিলো সুরুয়ার মত ধোঁওয়াওঠা দুপুর। স্যাংচুয়ারীর তেলচিটে জানলাগুলো বরাবরের মত ঝাপসা ৷ একে অন্যের লাঠিগুলো চেপে ওরা শেষবারের মত, কয়েক মিনিটের জন্য দাঁড়িয়েছিলো ওক গাছের অন্ধকারে আরো বেশী অন্ধকার হয়ে।- মাত্র এটুকু বলে বৃদ্ধ কেয়ারটেকার চুপ। আকাশ ফেটে তখন ঝামরে পড়ছেন বীটোফেন আর তুমি নতুন করে শিখছো তোমার ছোটবেলা ফুরিয়ে গ্যাছে।

 

৫.
দশবছর আগের টিথোনিয়া, তুমি ঘুরেফিরে আবার এসেছো মুগ্ধতার কাছে। পাকদন্ডী বেয়ে নিজেকে টেনে নিয়ে উঠছো তো উঠছোই য্যানো আরেকটু এগোলেই ওঁয়া দিয়ে উঠবে ডাম্পলিং ঘ্রাণ। ছটফটে লেপচা বস্তীতে জুটে যাবে কিছু একটা, মোক্ষ বা নিদেনপক্ষে বাঁধাকপির স্যুপ। দশবছর আগের টিথোনিয়া, তুমি টেরও পাও নি কখন উল্টোদিকে হাঁটতে হাঁটতে তুমি সেই ঘিনঘিনে টুরিস্ট লজে ফিরে এসেছো যেখানে প্রত্যাশিত ভাবেই দেওয়ালগুলোর রঙ আঠালো আর ম্যানেজার কাঠ কাঠ স্বরে শুকনো মাংসের ভাষায় কথা বলে।

 

৬.
নিরুদ্বেগ এই রিসর্টের জানলা। শার্সিতে ফোঁটা ফোঁটা ভাবলেশহীন কিছু মেঘ । নিরুত্তাপ৷ গতানুগতিক। অদ্ভূত রকমের সাদাটে নিরাপত্তায় মোড়া এই কেবিনে তোমাকে রাখা হয়েছে কয়েক হপ্তার জন্য মাত্র। তোমাকে শেখানো হয়েছে পশমিনা চাদরের রকমফের আর ঘরোয়া পদ্ধতিতে স্নফি বানানোর সহি তরিকা। এখানে আবহাওয়া শান্ত৷ শুধু অদূরবর্তী মনাস্ট্রি থেকে গ্রিনফিঞ্চের সুরে ভেসে আসা ‘ওঁম মণিপদ্মে হুম’। এখন তোমাকে খোলামেলা ভাবে ঘুমোতে দেওয়া হয়েছে যতক্ষণ না তোমার পশম থেকে একটা একটা করে সমতলের অভ্যেস খসে পড়ে।

 

৭.
ফিরে যাবে বলে তো আসোনি৷ নেপালী কিশোরের ঝমঝমে মিশে যাবে বলেই না এত দূর আসা৷ পাহাড়ী হর্নবিলের ডাকে বেলা পড়ে এলে তোমারও চূড়ায় এসে চুঁইয়ে পড়বে বিকেলের রোদ। সন্ধ্যায় কন্যিয়াকের গ্লাসে রুবাবের মত বনফায়ার নামবে আর আস্তে আস্তে তোমার ভিতরের, এই এতদূর টেনে আনা সেই কষ্টকর গাছগুলো নিভে যাবে। এসবই তো ভেবে আসা। কাউকে না জানিয়ে। একা একা। আততায়ীর মত।

 

৮.
ঘুণাক্ষরেও ভাবোনি মাত্র চোদ্দোশো ফিট পেরোতে না পেরোতেই তোমার সাথে কথা বলা হবে এক ঘোরলাগা ক্ল্যারিনেটের স্বরে৷ ভাবোনি বরফের চাঁই থেকে ছিটকে এসে চাপ চাপ রোদ তোমার চোখ ঝলসে দেবে। কেউই, এমনকী তুমি নিজেও জানতেনা , নিশ্বাস চনমনে রাখতে ভিটামিন ট্যাবলেট আর কিসমিস এগিয়ে দিচ্ছে দেহাতি যে সামরিক পোশাক, সে তোমার কানে কানে অবিকল তোমার হরফে ফিসফিস করে উঠবে ‘অনেক পালিয়েছো। এবার ফিরে যাও।’

Facebook Comments

Hits: 412

Related posts

Leave a Comment