অনিমিখ পাত্র

পৃথিবীর শেষ লেখা

গাছেরা এখন প্রতিশোধ নিচ্ছে।

 

চমকে যাবেন না। আপনি যদি আমার লেখার খাতাটা হাতে পেয়ে থাকেন, আমার ভাষা যদি আপনার বোধগম্য হয়, তাহলে এই লেখা একটা মর্মান্তিক ইতিহাসের বিরাট দলিল হয়ে থাকবে। গুছিয়ে রাখবেন। আপনাদের নতুন পৃথিবীতে এই লেখাটার ধর্মগ্রন্থের মতো ঘরে ঘরে বিরাজ করা উচিৎ। যাতে আপনারা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে পারেন। আমাদের ভুল যেন আপনাদের না হয়। আপনারা যদি গাছের বিকল্প বানিয়ে ফেলে থাকেন, তাহলেও এই দলিল আপনাদের বারংবার আত্মতুষ্টি থেকে বিরত রাখবে। আর গাছেদের যদি আপনারা আবার দমন করে ফেলতে সক্ষম হন, তাহলেও আমার লেখা অভিজ্ঞতা আপনাদের সদা সতর্ক ও সন্দেহপ্রবণ থাকতে সাহায্য করবে। আর যদি এই লেখাটা কেউ আবিষ্কার না করে, এর হৃদ্‌স্পন্দন যদি অপেক্ষায় থাকতে থাকতে বন্ধ হয়ে যায় ( যেটা ঘটার সম্ভাবনাই ষোলো আনা ), তবুও আমাকে লিখে যেতেই হবে প্রাণপণ। যতক্ষণ না আমি ধরা পড়ে যাচ্ছি। যতক্ষণ না তুষারের পুরু চাদর এসে আমাকে ঢেকে দিচ্ছে, এই প্রাণপণ লিখে যাওয়া ছাড়া আমার আর উপায় নেই কোনো …

*

এইই হয়তো আমার জীবনের শেষ লেখা। হয়তো এই মানবসভ্যতারও। আর সেই শেষ লেখাটা কিনা কোনো কবিতা নয়, গল্প নয়, হতে হল এক মৃত্যুমুখী লোকের জীবনের অন্তিম ক’টা দিনের কল্পনাবিহীন এক ডায়েরি। হায়! একসময় ভাবতাম মরবার আগে কালজয়ী কোনো মহাকাব্য লিখে যাবো আমি। আমার সমস্ত অভিমানের সমস্ত জলহাওয়া ভরে দেবো তাতে। আমার সমস্ত না-পাওয়া মিটিয়ে দেবে সে। অন্তত অনন্য কোনো কবিতার মধ্যে শেষ হবে আমার জীবন। এখন ভাবলে হাসি পায়! জন্মের পরিকল্পনা করা যায়, অথচ পছন্দমত স্বাভাবিক মৃত্যু কেউ সাজিয়ে নিতে পারে না। কোথায় সেই রোমান্টিক বিলাসবহুলতা! হয়তো আমার জীবনের শেষ লেখাটির কোনো পাঠকই জুটবে না। একটা লেখার মালিকানা আসলে লেখকের না পাঠকের – এ নিয়ে বন্ধুমহলে লেখকমহলে কত তর্ক করেছি একদিন- মনে পড়ে। হাসি পায়, এই মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও আমি কোনো এক পাঠককে কল্পনা করে নিচ্ছি ঠিকই।

আমি এখন হিমালয়ের এক দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলে, ক্ষুধা তৃষ্ণা আর শৈত্যপ্রবাহে কাঁপছি। এই এলাকাটা বরাবরই জনবিরল। অনেককাল আগে, যখন পৃথিবীটা বিভিন্ন দেশের গন্ডীতে বাঁধা ছিল, তখন এই এলাকাটা ছিল হিমাচল প্রদেশ নামে একটা রাজ্যের মধ্যে। আমি এখন যেখানে আছি, এই বিরাট বিরাট পাথরখন্ডের আড়ালে- এরা যেন প্রাগৈতিহাসিক শব্দটাকে মূর্ত করে তোলে, এই অঞ্চলের একটু দক্ষিণে স্পিতি নদী বয়ে গেছে। আমার এই জায়গাটা বেছে নেওয়ার পিছনে কয়েকটা কারণ আছে। এক, আমার চেনা জায়গাগুলোর মধ্যে এই পাহাড়ি মরুটিই সবচাইতে গাছবিরল। হ্যাঁ, জনবিরলতা নয়, গাছবিরলতাই আমার একমাত্র পরিত্রাণ এখন। তাই, স্পিতি উপত্যকায় থেকে যেতে সাহস পাইনি আমি। কে না জানে, নদীর সঙ্গে তথা জলের সঙ্গে গাছের সম্পর্ক মানুষের চেয়েও নিবিড়। আমি উঠে এসেছি আরো উত্তরে। লাহুল অঞ্চলে। ইচ্ছে ছিল যাবো আরও উত্তরে। তিব্বতে। হলো না। এখানে বৃষ্টি হয়না। সরাসরি তুষারপাত হয়। সুতরাং একদিক থেকে কিছুটা নিশ্চিন্তি। তবে, গাছেরা যদি আমাকে নাও খুঁজে পায়, তুষারসমাধি আমার ভাগ্যে নাচছেই। তবু ভালো, ঘন বরফের মধ্যে যদি মৃত্যু হয় আমার, দেহ অবিকৃত থেকে যায় যদি, আপনারা – ভবিষ্যতের অধিবাসীরা আমাকে খুঁড়ে তুলবেন নিশ্চয়ই। সঙ্গে আমার এই নোটটা পাবেন। এটায় আমার এই পুরনো পৃথিবীর রূপ-রস-শব্দ-স্পর্শ-গন্ধ যথাসাধ্য লিখে রাখছি আমি। আপনারা নিশ্চয়ই পড়তে পারবেন এই লেখা। আমার যৌবনকালেই তো একটা সফটওয়্যার বেরিয়ে গিয়েছিল- অল ল্যাঙ্গুয়েজ ইন বিল্ট ট্রান্সলেটর। আলাদা করে যন্ত্র হিসেবেও ক্যারি করা যেত। আবার মাথার হেডচিপে ইন্সটল করিয়ে নিলেও হত। যেকোনো ভাষাকেই সে যেকোনো ভাষায় চোখের নিমেষে ট্রান্সলেট করে দিত। লিখিত এবং মৌখিক দুইই। ধরুন আপনি জাপানি ভাষা জানেন না, তবু একজন জাপানির সঙ্গে কথাবার্তা চালাতে আপনার বিন্দুমাত্র অসুবিধে হবে না। আপনি এই ALT সফটওয়্যারটি চালু রাখলে সেই বিদেশি বা বিদেশিনীর কথাও আপনার কানে আপনার নিজের ভাষাতেই প্রবেশ করবে। আর লেখার ক্ষেত্রে তো ল্যাঙ্গুয়েজ স্ক্যান করে নিলেই হল। অবশ্য আমার যৌবন ফুরোতে ফুরোতেই এইসব স্ক্যান-ট্যান করার প্রয়োজনীয়তাও ফুরিয়ে এলো। সারা পৃথিবী জুড়ে ব্যবহার বাড়তে লাগলো ‘কম’ এর। COM অর্থাৎ Common Optimum Medium। এক সাধারণ যৌথ ভাষা যা সারা পৃথিবীতেই এক। ফলে যোগাযোগের প্রতিকূলতা অনেকটা কমে গেল। মিয়ামি থেকে মেদিনীপুর- সবার ভাষার নামই হলো ‘কম’। ফলে পৃথিবী থেকে হাজার হাজার ভাষা ক্রমে মুছে যেতে থাকলো। ইংলিশ কিছুদিন সমানতালে পাল্লা দিয়েছিল বটে। এখনো প্রত্যন্ত ও বিচ্ছিন্ন গ্রামটামে লোকে পুরনো ভাষায় কথা বলে। স্যরি, মানে বলতো। এখন তো সত্যিই সব সমান হয়ে গেছে। এখন তো আর প্রায় মানুষই উধাও। সব মানুষই এখন তার অনুপস্থিতি দিয়ে সমান হয়ে গেছে। আমি ছিলাম এক সন্ধিসময়ে জন্ম নেওয়া লোক। আমার একটা স্বাভাবিক মাতৃভাষা ছিল। বহু ভাষাভাষী দেশে জন্মে আমাদের আরো দু-তিনটে ভাষা স্বভাবতই শিখতে হয়েছিল। তারপর তো সব আবার মোছার পালা। অর্ধেক জীবনে এসে ‘কম’ রপ্ত করতে হলো। তবে সব মোছা কী আর অতই সহজ! ভাষা ব্যাপারটা দুঃখের মতো। তাড়াতে চাইলেও সহজে যায় না। তাই আমি বুকের ভেতরে একটা বিকল্প দুনিয়া তৈরি করলাম। তাতে স্নেহের জলে ডুবিয়ে যত্নে রেখে দিলাম আমার পুরনো ভাষাগুলো। সুতরাং এই মুহূর্তে আমি এই পৃথিবীর একমাত্র বাংলা জানা লোক। আর এই ডায়েরি আমি ইচ্ছে করেই লিখে গেলাম বাংলাভাষায়। মৃত্যু আসন্ন। পালিয়ে আসার সময় বিশেষ কিছুই তো সঙ্গে নিয়ে আসতে পারিনি! সঙ্কটকালে তো প্রিয় মুখগুলোই মনে আসে, প্রিয় স্মৃতিগুলোর ওপরে একটু হাত বুলিয়ে দিতে ইচ্ছে হয়। তাই বুকের সেই যত্নখোপ থেকে বের করে আনলাম আমার মাতৃভাষাকে। এই ভাষাই এখন আমার যতটুকু মা। আপনারা নতুন দুনিয়ার নতুন মানুষ। যদিও মানুষ বলে আপনাদের ডাকা যাবে কিনা জানি না। আপনারা যদি আদৌ পড়েন এই লেখা তো আপনাদের এটা এমনিতেই প্রত্নতাত্বিক নিদর্শন বলে মনে হবে। সুতরাং এই পুরনো দুনিয়ার কথা নাহয় আরো পুরনো দুনিয়ার একটা ভাষাতেই লেখা থাক। তবে, আপনারা এই লেখার কদর করবেন- এ বিশ্বাস আমার আছে।

ওঃ হো! কথায় কথায় কতদূর চলে এসেছি! দ্বিতীয় কারণটা বলি। আমি এমনিতে একটু ভীতু টাইপের মানুষ। যদিও এখন ভয় পেতে পেতে ভয় চলে গেছে। আর আমি বেশ স্মৃতিকাতর। পরিচিতের গন্ডিতেই পোষা কুকুরের মত ঘুরপাক খাওয়া আমার চিরকেলে স্বভাব। পুরনোকে জমিয়ে জমিয়ে নতুনের রাস্তা ব্লক করে ফেলি। সহজে আমার সঙ্গে কারো শত্রুতা হয়না। কেউ আমাকে তেমন আমল দেয় না মোটে! এই নরমসরম ব্যাপারের জন্যই বোধহয় গাছেরাও আমাকে তেমন ধর্তব্যের মধ্যে আনে নি। তাই হয়তো পালাতে পেরেছি। এখনো অবধি টিকে আছি আমি। কিন্তু আর সময় নেই, আমি জানি। ওরা খুব তৎপর আর চূড়ান্তরকম নিষ্ঠুর হয়ে উঠেছে। কোথায় যে কী ফাঁদ কী ক্যামোফ্লেজ সাজিয়ে রেখেছে কে জানে! এই উপত্যকা অঞ্চলে বহুযুগ আগে একবার বেড়াতে এসেছিলাম। তাই যখন পালাবার সুযোগ এলো, খুব দূরে কোথাও একেবারে অচেনা কোথাও যাওয়ার ঝুঁকি নিতে সাহস হয়নি আমার। ইউরোপ আমেরিকা- যেখানে খুশি যাওয়া যেত। এখন আর পাসপোর্ট ভিসা লাগে না। বস্তুত, এখনকার প্রজন্ম এসবের নামই শোনেনি। আমার যৌবনেই অসন্তোষ ঘনিয়ে উঠেছিল মানুষের মধ্যে। কেউ আর রাষ্ট্রের ছড়ি ঘোরানো মানতে চাইছিল না। এই অসন্তোষ চূড়ান্ত রূপ নেয় ‘ফ্রি প্ল্যানেট’ আন্দোলনের মাধ্যমে। দাবানলের মত সারা পৃথিবীর ছোটো বড়ো সমস্ত দেশে ছড়িয়ে যায় এর আগুন। শেষমেশ, যখন প্রায় আরেকটা বিশ্বযুদ্ধ লাগবার উপক্রম হয় তখন সারা পৃথিবীর রাষ্ট্রনেতারা একজোট হয়ে বৈঠক করেন। বৈঠকটা অবশ্য পৃথিবীর মাটিতে হয়নি। নেতারা তখন পালিয়ে বেড়াচ্ছেন ক্ষ্যাপা জনতার হাত থেকে বাঁচার জন্য। একটা স্পেস স্টেশন ( নামটা মনে পড়ছে না ) থেকে তারা পৃথিবীর স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। রাষ্ট্রসংঘ ভেঙে দেওয়া হয়। পৃথিবী এই ভাবে দেশমুক্ত হল। যেকোনো মানুষ যেকোনো জায়গায় গিয়ে থাকতে পারবে, যেমন খুশি চলতে পারবে, চিন্তা ও দেহ বিনিময় করতে পারবে – একটা ফ্রি জোন এ পরিণত হল এই গ্রহ। আমার তখন মাঝবয়স। আজন্ম এরকম একটা সীমানাবিহীন ভূখন্ডের স্বপ্ন দেখেছি আমি। তবু, সেটা যখন সত্যিই হল, পুরনো ছেড়ে যাওয়া পৃথিবীটার মায়ায় আমি আরো একটু গুটিয়ে নিলাম নিজেকে।

*

এই যে লিখছি জীবনের শেষ লেখাটা, এতেও হয়তো বিরাট একটা ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে। কে জানে, হয়তো এভাবেই আমি আরো বিপদের মুখে আরো ত্বরাণ্বিত মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছি নিজেকে। প্রায় দু’মাস হলো আমি এই অঞ্চলে আশ্রয় নিয়েছি। শেষতম মানুষের মুখ দেখেছিলাম তারও দেড়মাস আগে। হয়তো এতোদিনে আর কেউই বেঁচে নেই। কিংবা আমারই মতো ছড়িয়ে ছিটকে গেছে দু-চারজন এদিকে ওদিকে- আফ্রিকার মরুকন্দরে কিংবা আন্টার্কটিকার আশেপাশে । হয়তো আমারই মত শ্বাসরুদ্ধ করে মৃত্যুর দিন গুনছে। এতদিনে গাছেরাও নিশ্চয়ই টেকনিক্যালি আরো এগিয়েছে। যে কোনো মুহূর্তে হয়তো ওদের মারণরশ্মি ছুঁয়ে ফেলবে আমাকে।

একটু আগে যে ভাষার কথা ভাষাযন্ত্রের কথা এত বিশদে লিখলাম তার একটা অন্য কারণও আছে। ব্যাপারটা প্রথম ধরা পড়ে ওই ALT যন্ত্র থেকেই। একটা সময় আসে যখন সারা পৃথিবীতে ওই ‘কম’ ই হয়ে ওঠে একমাত্র ভাষা। ফলে, ALT যন্ত্রের প্রয়োজনও ফুরিয়ে যায়। আমার তখনও যৌবন চলে যায়নি। তখন ওর প্রস্তুতকারক সংস্থাটি নিজেদের অস্তিত্বরক্ষার স্বার্থেই সফটওয়্যার টাকে নিয়ে নানা পরীক্ষানিরীক্ষা চালাতে থাকে। নানান আপগ্রেডেড ভার্সান বাজারে এনে টিকে থাকার চেষ্টা করে সে। কম্পানিটি ক্রমশই চেষ্টা করে পশুপাখিদের ভাষাও অনুবাদ করতে। খানিকটা সফলও হয়েছিল তারা। ভাষা আর সফটওয়্যারের মধ্যে একটা রিলে রেসের মত ব্যাপার হয়। এ ওর কাছ থেকে ব্যাটন নিয়ে খানিকটা এগিয়ে যায় তো আবার ও সেই ব্যাটন এর কাছ থেকে খানিক পরেই তুলে নেয় হাতে। শোনা যাচ্ছিল, কিছু কিছু নীরব অভিব্যক্তিরও অনুবাদ করে দেবার একটা প্রজেক্ট হাতে নিয়েছিল ALT কম্পানি। মানে ধরুন, প্রেমিকার সঙ্গে ঝগড়া হয়েছে আপনার, সে অনেকক্ষণ ধরে চুপ করে রয়েছে, প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে না আর আপনি অস্থির হয়ে উঠছেন- এমন অবস্থায় এই উন্নততর সফটওয়্যার আপনাকে তার মনের খবর ট্রানস্লেট করে এনে দেবে। কিন্তু এই প্রজেক্টের খবর বাজারে বেরিয়ে যেতেই সারা পৃথিবী জুড়ে তর্ক বিতর্ক শুরু হয়ে যায়। সেই ‘ফ্রি প্ল্যানেট’ আন্দোলনের বর্ষীয়ান নেতা এবার ‘নীরবতা বাঁচাও’ আন্দোলনের ডাক দেন। পরিস্থিতি আঁচ করে কম্পানি এই গবেষনা আপাতত স্থগিত রাখে। যাইহোক, এইসব পরীক্ষার নিরীক্ষার মধ্যেই প্রথম একটা অজানা তরঙ্গসঙ্কেত ধরা পড়ে।

*

প্রথম যখন এই অজানা তরঙ্গসঙ্কেত ধরা পড়ে তখন বেশ একটা সাজো সাজো রব পড়ে যায় আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানীমহলে। যাক্‌, তাহলে এতদিনে সত্যি সত্যিই এলিয়েনের খোঁজ মিলল –এমনই ভেবেছিলেন অনেকে। গোপন কথাটি ক্রমে আর গোপন থাকে না। নতুন পৃথিবীর নিয়ম অনুযায়ী এই আবিষ্কার ALT কম্পানির নিজস্ব পরীক্ষাগারে ঘটলেও, জানাজানি হয়ে যাবার পর তা আর কম্পানি কুক্ষিগত করে রাখতে পারে না। সারা পৃথিবীর আরো অনেক লব্ধপ্রতিষ্ঠ বিজ্ঞানী এই গবেষনায় স্বতোপ্রণোদিত হয়েই যোগ দেন। ক্রমে অনেক বিশ্লেষণের মাধ্যমে বোঝা যায় যে এই তরঙ্গ বাইরের স্পেস থেকে আসছে না। এই গ্রহের ভেতরেই এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাচ্ছে। অর্থাৎ যেন একটা নির্দিষ্ট স্থান আরেকটা নির্দিষ্ট স্থানের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে চাইছে। এই যোগাযোগপথগুলিকে রেখা দিয়ে আঁকলে মনে হয় যেন পৃথিবীর ম্যাপটা অসংখ্য সরু সরু জালিকায় বাঁধা পড়ছে। বিজ্ঞানীরা উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। গভীর ধৈর্য্য ও মনোযোগ দিয়ে তারা ডেটা কালেক্ট করতে থাকেন, ল্যাবে তাদের বিশ্লেষণের জন্য আরেকটা স্পেশ্যাল টিম তৈরি হয়। নাওয়াখাওয়া বস্তুতই মাথায় উঠে যায়। একমাস কিছুদিন অতিক্রান্ত হবার পর এই তরঙ্গসঙ্কেতের একটা প্যাটার্ন পাওয়া যায়। দেখা যায় যে, ছিন্নবিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন স্থান থেকে আসা এই তরঙ্গসঙ্কেত এক একটা বিশেষ ভৌগোলিক স্থানে এসে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। অর্থাৎ কোনো কোনো বিশেষ জায়গা সারা পৃথিবীর তুলনায় বেশি পরিমাণে সঙ্কেত চুম্বকের মত টেনে নিচ্ছে নিজের কাছে। এই জায়গাগুলোকে যদি এপিসেন্টার বলি তো দেখা যাবে এই কেন্দ্রগুলি কোনোটা অবস্থান করছে রাশিয়ার তৈগা অঞ্চলে, কোনোটা ভারতের পূর্ব হিমালয়ে আবার কোনোটা বা আফ্রিকার জাইরে নদী তীরবর্তী অঞ্চলে। তবে সবচেয়ে বড় সেন্টার প্রধানতমটি হল আমাজন অববাহিকায়। বিজ্ঞানীরা আন্দাজ করেন যে এই তরঙ্গসঙ্কেতের মাধ্যমে আসলে কোনো বার্তা যাচ্ছে এইসব কেন্দ্রগুলিতে। অনেকটা যেমন পুরনো পৃথিবীতে গুপ্তচর সংস্থা বা উগ্রপন্থী সংগঠনগুলো যে উপায়ে পরষ্পরকে বার্তা পাঠাত নজরদারি এড়িয়ে। তবে কি নির্মূল হয়ে যাওয়া সন্ত্রাসবাদীরা আবার সক্রিয় হয়ে উঠল? বিজ্ঞানীরা এইসব সঙ্কেতের মর্মোদ্ধার করতে জানপ্রাণ লড়িয়ে দিলেন।

এইখানে ঘটমান বর্তমান থেকে একটু বিরতি নেওয়া যাক। বেশি সময় হাতে নেই বেশ বুঝতে পারছি। বাইরের প্রকৃতিও খুব খামখেয়ালি হয়ে উঠেছে। কাল সারাদিন চারপাশটা থমথম করছিল। কী যেন একটা ঘটবে- এই আশঙ্কার বীজ ছড়িয়ে যাচ্ছিল বাতাসে। আজ আবার বোধহয় একটা তুষারঝড় আসতে চলেছে। বেশ কিছুদিন আমি একই জায়গায় রয়েছি। বেশ কয়েকটা বড় বড় পাথর এখানে ভালোমতো একটা আড়াল তৈরি করেছে। যদিও তাতে তেমন কিছু লাভ নেই, জানি। ওরা তো সেভাবে দেখতে পায়না, মানুষের হৃদ্‌স্পন্দন টের পায় ওরা। আর মারণরশ্মি পাঠায়। চামড়া ফুটো করে সেই রশ্মি ঢুকে পড়ে শরীরের ভেতর, রক্তে চারিয়ে যায়। গোটা দেহে আস্তে আস্তে ছত্রাক ফুটে উঠতে থাকে। একসময় একটা গোটা মানুষ মাটিতে মিশে যায়। নানারকম ছত্রাকের সীডবেড মনে হয় তাকে। মোটামুটি ২৪ ঘন্টার মধ্যে এই মারণপ্রক্রিয়া কিংবা রূপান্তরকরণটি সম্পন্ন হয়ে যায়। সবথেকে মারাত্মক ব্যাপার হলো, আক্রান্ত মানুষটি সজ্ঞানেই এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন। মানে সবার শেষে মাথায় সংক্রমণ হয়। তার আগে অবধি জ্ঞান থাকে, তাকে অসহায়ভাবে চেয়ে চেয়ে দেখতে হয় নিজের এই করুন পরিণতি। আমার ভিতরে ক্রমশ কেমন একটা জট পাকিয়ে যাচ্ছে। কী করবো বুঝে উঠতে পারছি না। মরতে কারই বা ইচ্ছে হয়, কিন্তু এইরকম সহায় বান্ধবহীন মৃত্যুপুরীতে বেঁচে থেকেই বা লাভ কী! সংগ্রাম করবার ইচ্ছে চলে যাচ্ছে আমার। আমি জানি, এক জায়গায় বেশিদিন থেকে যাওয়া ঠিক হচ্ছে না আমার। আবার নড়াচড়া করলেও বিপদের ঝুঁকি আছে। সুতরাং এই লেখাটার মধ্যেই যেন আমার প্রাণভোমরা আটকে রয়েছে। এই লিখে লিখেই কথা বলছি আমি। আপনাদের সঙ্গে বলছি। নিজের সঙ্গেও। শিউরে উঠছি ভেবে যে মানবজাতির হয়তো বা শেষ প্রতিনিধি হিসেবে অধুনালুপ্ত বাংলাভাষার শেষ দলিল লিখে যাচ্ছি আমি। এই লেখা আমার মৃত্যুকে ঠেকিয়ে রেখেছে।

সুতরাং আমার পুরনো পৃথিবীটার কথা আরেকটু বলে নেওয়া যাক। আমি যে সময়টায় বেড়ে উঠেছিলাম তখন পৃথিবীতে বেশ কিছু দুরারোগ্য মারণ অসুখের রমরমা ছিল। এইডস, ক্যান্সার, ইবোলা, থ্যালাসেমিয়া, হেপাটাইটিস ইত্যাদি। অতীতের বেশ কিছু অসুখও ভোল পালটে নতুনরূপে হানা দিচ্ছিল সেই সময়। তারপর আস্তে আস্তে চিকিৎসাশাস্ত্র সাফল্যের শিখরে আরোহণ করলো। চিকিৎসা নেই এমন আর কোনো অসুখই রইল না পৃথিবীতে। ঠিক সময়ে ওষুধ প্রয়োগ করলে সমস্ত অসুখই সেরে যায় এখন। স্বেচ্ছামৃত্যু কিংবা পথদুর্ঘটনা রইল। কিন্তু মানুষের গড় আয়ু অনেক বেড়ে গেল। একশ পেরনো এখন কোনো ব্যাপারই নয়। এবং মানুষ মৃত্যু অবধি বেঁচে থাকল সুস্থ সবল শরীর নিয়েই। কেবল অ্যালার্ম ঘড়ির মতো সময়মতো একদিন মৃত্যু এসে শরীরের এক্সপায়ারি ডেট ঘোষণা করে দিয়ে যায়। এই আমারই বয়স এখন আটানব্বই। একশতম জন্মদিনে খুব ধুমধাম করার ইচ্ছে ছিল। সে আর হলো না। আরো কুড়ি তিরিশ বছর দিব্বি বেঁচে নিতে পারতাম, কতো কী দেখতাম আরো- সেও আর হলো না।

যাইহোক, আজ থেকে প্রায় বত্রিশ বছর আগে মানুষ আরো একটা বড়ো আবিষ্কার করে। মানবজাতির সেই সবচেয়ে বড়ো আবিষ্কারই, আজ বোঝা যাচ্ছে, ছিল মানবজাতির এক করুণ আত্মহত্যা। সেদিন যা ছিল চূড়ান্ত মুক্তির নিশান, আজ তা দেখা যাচ্ছে চূড়ান্ত অবলুপ্তির কারণ। আবার এও ভাবি যে, হয়তো এইই হওয়ার ছিল। এইই হয়তো স্বাভাবিক পরিণতি মানুষের। এইবার আসল কথাটা বলি।

আজ থেকে বত্রিশ বছর আগে বিজ্ঞানীরা গাছের বিকল্প তৈরি করে ফেলেন। অবাক হচ্ছেন? আপনাদের নতুন পৃথিবীতে গাছের অস্তিত্ব আছে কিনা জানিনা। তাই একটা ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করি। আর আমার মাথার মধ্যে একটা ন্যানো কার্ড লাগানো আছে। ওখানে পুরনো পৃথিবীর অনেক অডিও ভিস্যুয়াল আছে। ওখান থেকেও আপনারা গাছের চেহারা চরিত্র দেখে নিতে পারেন। অবশ্য ততদিন যদি সেসব অক্ষত থেকে থাকে! আপাতত যেহেতু এই লেখা ছাড়া আমার কোনো সহায় নেই, আমি ছোট্টো করে দু’লাইন বলি। গাছেরা ছিল পৃথিবীর আদিমতম সন্তান। যদিও তাদের আমরা প্রানী’র স্টেটাস দিইনি কখনো। ভুল করেছিলাম। তারা আমাদের লক্ষ লক্ষ বছর আগে জন্মে আমাদের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ অর্থাৎ আমাদের আঁতুড়ঘর প্রস্তুত করে রাখে। ওরা প্রানীকূলের জন্য এবং মানুষের জন্যও অক্সিজেন উৎপন্ন করতো। এই অক্সিজেন ছাড়া আমরা অচল, আমরা মৃত। বিনিময়ে গাছেরা হয়তো একটু ভালোবাসা আর সম্মান আশা করেছিল যা আমরা দিইনি। আমরা ওদের হেয় করেছিলাম। নিঃশর্তভাবে অযাচিতভাবে কোনোকিছু পেলে তাকে কেউ আমল দেয় না, মূল্য দেয় না- এই হলো মানুষের চিরকেলে নিয়ম। আমাদের বাংলা ভাষায় একটা লব্জ আছে – শক্তের ভক্ত, নরমের যম। মানুষ বরাবরই তাই – সে বিনয়ীকে হ্যাটা করে, দুর্মুখকে মান্য করে চলে। উপরন্তু, গাছেরা যেহেতু গমনে অক্ষম এবং তাদের আলাদা করে হাত-পা-মস্তিষ্ক ইত্যাদি নেই, আমরা ধরেই নিয়েছিলাম যে তাদের কোনো ভাষা নেই, কমিউনিকেশন নেই। সেই কবে এক বাঙালি বিজ্ঞানী ‘গাছের প্রাণ আছে’ – দেখিয়ে গিয়েছিলেন; বাংলা ভাষার মতই আমরা তাঁকেও কবেই ভুলে গেছি! এবং গাছেরও যে প্রাণ আছে এবং প্রান থাকা মানেই যে তার ইভোলিউশন আছে- এ’কথা আমরা ভুলে গিয়েছিলাম। নির্বিচারে গাছ হত্যা তো মানুষ তার আবির্ভাবলগ্ন থেকেই করে আসছে। শেষ একশ বছরে তার হার বাড়ছিল মাত্রাতিরিক্ত ভাবে। আর কফিনের শেষ পেরেকটি পুঁতে দিল বত্রিশ বছর আগের ওই আবিষ্কার। এই দেখুন, এত আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ছি যে এতক্ষণ ধরে আবিষ্কারটা কি সেটাই তো বলিনি!

আগেই বলেছি, দেশের বেড়া উঠে যাবার পর কোনো গবেষণাই আর কারো কুক্ষিগত রইল না, সেইমত সমস্ত গবেষণাগারও সমস্ত জাত-ধর্ম-প্রদেশের বিজ্ঞানীদের জন্য উন্মুক্ত হয়ে যায়। সেইরকম এক মুক্ত গবেষণাগারে একদিন তৈরি হয়ে গেল আমাদের ধ্বংসের শেষ অস্ত্র- AGO অর্থাৎ Artificially Generated Oxygen। মানুষের কফিনের শেষ পেরেক। অক্সিজেনের জন্য আমাদের আর গাছের ওপর নির্ভর করতে হল না। শহরে গ্রামে ( ততদিনে অবশ্য গ্রাম বলে আক্ষরিক অর্থে আর কিছু নেই, অপেক্ষাকৃত কম জনঘনত্বের জায়গাগুলিকেই পুরনো অভ্যেসবশত গ্রাম বলা হয় তখন। ) ইলেক্ট্রিকের মত বড় বড় অক্সিজেন প্লান্ট বসে গেল। এক একটা নির্দিষ্ট এলাকার বাতাসে অনবরত অক্সিজেন পাম্প করতে থাকল তারা। দশবছর আগে বাজারে এল ছোটো ছোটো অক্সিজেন জেনারেটর মেশিন। যাদের চাহিদা বেশি তারা এয়ার কন্ডিশনারের মত বাড়িতে ওই মেশিন বসিয়ে নিয়ে একেবারে নিশ্চিৎ হতে চাইল। ইদানিং পোর্টেবল পকেট জেনারেটরও বাজারে এসেছে।

প্রথম দিকে একেবারে গোটা দুনিয়া মেতে উঠলেও ধীরে এর দুটো মারাত্মক প্রতিক্রিয়া হল। এক, মানুষের আর জয় করবার মত কিছু থাকল না বিশেষ। ছেলেবুড়ো নির্বিশেষে মানুষ কেমন যেন ঝিমিয়ে পড়তে লাগল ক্রমশ। একটা যেন ডিপ্রেসনের চাদর আস্তে আস্তে ঢেকে ফেলতে থাকল পুরো মানবসভ্যতাকে। দুই, গাছেদের আর কোনো দরকারই রইল না। সুতরাং মানুষেরা মহোল্লাসে বৃক্ষ নিধন যজ্ঞে নেমে পড়লো। পাঁচ বছরের মধ্যে শহরাঞ্চলগুলি সবুজমুক্ত হয়ে গেল। যেখানে গাছ দেখল মানুষ বিনা কারণে মেরে ফেলল তাদের। কিছু মানুষ অবশ্য আটকানোর চেষ্টা করেছিলেন, লেখালিখি সেমিনার করেছিলেন- কিন্তু বৃহতের চিৎকারে মুষ্টিমেয়’র কথা সবদিনই চাপা পড়ে যায়। কিছু মানুষ আবার স্মৃতি হিসেবে শোপিস হিসেবে বনসাই করে কিছু গাছ বাড়িতে সাজিয়ে রাখলেন।

আর এই ঘুরে দাঁড়ানোর সূচনাও করলো কিন্তু ওইসব জোর করে বেঁটে করে রাখা, মিউজিয়াম স্মারকের মত সাজিয়ে রাখা কৃত্রিম মনোহরণের সামগ্রী হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকা ওইসব মানুষঘেঁষা গাছেরাই। ওইসব বনসাই। অত্যাচারিত মানসিকভাবে বিপর্যস্ত গাছগুলো। যেন মার্কসবাদী বিপ্লবের সফলতম নমুনা তৈরি হলো পৃথিবীতে। কিন্তু মানুষের হাত ধরে নয়। মার্ক্স এই গাছ আর মানুষের শ্রেনীবিভাজনকে হিসেবে রাখেন নি মোটেই। তো, আমরা মানুষেরা তো আমাদের সুখ সমৃদ্ধি ছাড়া অন্যকিছু কক্ষনো ভাবতে শিখিনি। অথচ আমরা জানতাম বিবর্তন সক্কলের হয়। জিরাফ খাদ্য আহরণের সুবিধার্থে গলা লম্বা করতে করতে একসময় গাছের ডাল ছুঁয়ে ফেলল- এরকম ভাবতে পেরেছি, কিন্তু সেই গাছেরা কখনো ইন্টেলিজেন্স অর্জন করতে পারে ঘুণাক্ষরেও চিন্তা করিনি। অন্যকে খাটো চোখে দেখার মাশুল সুতরাং মানুষকে তো দিতেই হবে আজ।

ALT র ল্যাবে ওই তরঙ্গসঙ্কেত যখন ধরা পড়লো তার এক দশক আগে থেকেই মাঝে মাঝেই অজানা কিছু রোগ ঢুকে পড়ছিল মানবশরীরে। পুরনো পৃথিবীর পুরনো কোনো অসুখ সেসব নয়। বিজ্ঞানীরা অবশ্য যথাসাধ্য লড়েছেন। কিন্তু রোগ আক্রমণের মাত্রা ও প্রকার ক্রমশই বাড়ছিল। একটা অসুখের অ্যান্টিডোট আবিষ্কার হয়ে গেলে অসুখটিও তার চেহারা পালটে নতুন হয়ে দেখা দিচ্ছিল। তবে তখনও তা ভয়ঙ্কর কোনো বিপর্যয়ের পর্যায়ে চলে যায়নি। ল্যাবে ওই সংকেতের প্যাটার্নটাকে ভালো করে স্টাডি করলেন বিশ্বের তাবড় বিজ্ঞানীরা। এবং ব্যাপারটা একসময় বুঝতে পারা গেল। কিন্তু ততদিনে যা হবার হয়ে গেছে। বিজ্ঞানীরা শিউরে উঠলেন।

ততদিনে গাছেরা জোট বেঁধে ফেলেছে। তাদের ইভোলিউশন এর গতি মারাত্মক রকমের তখন। প্রথমদিকে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে অসহায়ভাবে টিকে থাকা গাছেরা, শৌখিন মানুষের টবের বনসাইরা, অস্তিত্বরক্ষার প্রাণপণ যুদ্ধ করতে থাকা গাছেরা খবর পাঠানোর নিজস্ব তরঙ্গ তৈরি করে ফেলেছে। তারা খবর পাঠাচ্ছে দাদাদের কাছে অর্থাৎ টিমটিম করে যেখানে এখনও সামান্য বনভূমি টিকে রয়েছে সেইখানে। সুতরাং নিয়মিত এসওএস যাচ্ছে আমাজনে তৈগায় পূর্ব হিমালয়ে। আমাজনের গহন অভ্যন্তরে এখনও যেখানে মানুষের আনাগোনা নেই, সেখানে তারা পালটা গবেষণাগার বানায়। তৈরি হয়ে যায় এইভাবে পৃথিবীর ভয়ঙ্করতম যুদ্ধের পটভূমি। অবশ্য একে যুদ্ধই বা বলি কী করে। মানুষ তো শুরু থেকেই স্ট্রেট সেটে হারছে। কী জানি, হয়তো এই আমিই পৃথিবীর শেষতম মানব প্রতিনিধি!

গাছেরা প্রথম দিকে বেশ কিছু মারণ ভাইরাস তৈরি করে ছড়িয়ে দেয় বাতাসে। তারই ফলে নতুন নতুন অসুখে মানুষ মারা যেতে থাকে। তবু সেসব সামলে নিচ্ছিলাম আমরা। কিন্তু ওরা তারপর স্ট্র্যাটেজি পাল্টালো। একেবারে সরাসরি রাডারের মত এলাকা ধরে ধরে চিরুণি অপারেশন চালাতে শুরু করলো ওরা। আগেকার দিনের সেই সন্ত্রাসবাদি সংগঠনের সুইসাইড স্কোয়াডের ধাঁচেই ওরা মানুষের দেহে ছত্রাক ঢুকিয়ে দিতে লাগল। যাকে প্রথম ধরলো মারণরশ্মি দিয়ে তাকে একেবারে পেড়ে ফেলল প্রথমেই। অসহায়ভাবে মারা যেতে থাকল মানুষ। তখনও আমরা জানিনা এসব কী করে ঘটছে। নিরাপত্তার নিশ্ছিদ্র চাদর এরকম ফুটো হয়ে যাচ্ছে কী করে!

যখন আমরা বুঝলাম পুরো ব্যাপারটা তখনও প্রতিরোধের স্ট্রাটেজি নিয়ে ঐকমত্য হলো না। কেউ কেউ বললেন বম্বিং করে সমস্ত গাছ গাছের ল্যাবরেটরি উড়িয়ে দেওয়া হোক। কিন্তু এখানে একটা বড়ো অসুবিধে আছে। এতে গাছ যেমন মরবে, মানুষ মরবে ততোধিক। তাছাড়া গাছেরা ততদিনে মাটির গভীর দিয়ে নিজের সারা পৃথিবী এফোঁড় ওফোঁড় করে পাইপলাইনের মত নিজেদের বিস্তারবীজ ছড়িয়ে দিয়েছে। একেকটা এলাকা ওরা মারণরশ্মি দিয়ে মানুষমুক্ত করছে আর সেখানে মাথা তুলছে বৃক্ষ গুল্ম ঘাসেরা। গাছের শিশুতে ভরে উঠছে মানুষের পূর্বতন পাড়াগুলো। তাদের নীরব কল্লোল ভাসছে হাওয়ায়। বাতাসে তখন কোটি কোটি বীজের উল্লাস। সুতরাং মানুষের ধাতব অস্ত্র নিশ্চল হয়ে পড়ে রইল। আমরা হেরে গেলাম।

আমাজন থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধ এখন সারা গ্রহের সর্বত্র। একেকটা নতুন কলোনি হয় গাছেদের আর তারা পরবর্তী অঞ্চলের দায়িত্ব নিয়ে নেয়। অন্যত্র ছড়িয়ে থাকা আর্ত গাছ সদস্যের সঙ্গে যোগাযোগ করে। তবে তাদের দেখতে এখনও গাছের মতই আছে। এখনো ওরা গমনে অক্ষম। শুধু বিশেষ বিশেষ নেতৃত্ব স্থানীয় গাছের শীর্ষশাখায় ব্যাঙের ছাতার মত একটা সবুজ অ্যান্টেনা দেখা যায়। গাছেদের কমিউনিকেশন। আর মানুষের হাজার বছরের ভাষা হারিয়ে গেল। মানুষও।

 

লেখা শেষ হয়ে আসছে। আর কিছু লিখতে ইচ্ছে করছে না। ইচ্ছে চলে যাওয়া মানে মৃত্যু। আমি এখনও মানুষ। যে কোনো মুহূর্তে আমার বিজাতীয় প্রাণস্পন্দন ওদের রাডারে ধরা পড়ে যাবে। তার আগে আমি চারপাশের প্রকৃতি পাথর বরফ নয়নভরে পান করছি। শরীর অবসন্ন। মনকে আর মন বলে চেনা যায় না। আসন্ন মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতে করতে সে অন্যরকম হয়ে গেছে। বেশ ক’দিন খাওয়া জোটেনি। বাতাস ভারি হয়ে এসেছে। আজ সকাল থেকে একটা অজানা গন্ধ পাচ্ছি। সম্ভবত ওরা আসছে। এসব তারই পূর্বাভাস। আজ সকাল থেকে খুব স্বজাতির কাউকে যে কোনো একজন মানুষকে প্রচন্ড আদর করতে ইচ্ছে করছে। মনে হচ্ছে, তুমুল একটা সঙ্গমের অভ্যন্তরে আমি যেন প্রস্তরীভূত হয়ে যাই। আমার মৃত্যু কেন আমার মনের মত হবে না? সম্ভবত আজ সূর্য ডোবার আগে আমি ধরা পড়ে যাবো। শুনেছিলাম গাছেরা যেসব অঞ্চলে অপারেশন চালায় তার আগে আগে সেখানে পৌঁছে যায় একটা বিশেষ গন্ধ। এইই কি সেই? তবে একটা ব্যাপার লক্ষ করছি, কয়েকদিন ধরে। প্রথম প্রথম চিন্তায় আচ্ছন্ন ছিলাম বলে খেয়াল করিনি। আজ করছি। এই এলাকার পাথরখন্ডের মধ্যে ইতস্তত মাটির মধ্যে যেন একটু একটু ধীর গতির নড়াচড়া হচ্ছে। কাল রাতে যে পাথরটাকে যেখানে দেখেছিলাম, আজ যেন সে সরে গেছে সেখান থেকে খানিকটা। হয়তো আমার মনের ভুল চোখের ভুল। আমি তো নিজেকে আর মানুষ বলেই চিনতে পারি না। একা থাকতে থাকতে মৃত্যুবোধের সঙ্গে থাকতে থাকতে আমি কিম্ভূতকিমাকার এক বস্তুতে পরিণত হয়েছি যেন। না, এবার চিন্তা থামাতে হবে। লেখাও। যদি সত্যিই আগামী পৃথিবীর অধিবাসীর হাতে, মানে আপনাদের হাতে এই লেখা গিয়ে পড়ে তবে এইরকম ভুল্ভাল প্রলাপ তাতে ঠাঁই পাওয়া উচিৎ হবে না। এখন থেকে আমি যথাসম্ভব তীব্রভাবে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করব। আর লিখবো শেষ পর্যন্ত। লেখা ছাড়া আমি সারা জীবন আর করলামই বা কী!

গন্ধটা তীব্রতর হচ্ছে। শেষবার ম্রিয়মান সূর্যের দিকে তাকালাম আমি। তাকে নমস্কার জানালাম। জীবনে প্রথমবার। মানে, শেষবারও। উল্টোদিকে তাকালাম এবার। ঢালু পাহাড় বেয়ে উঠে আসছে কেউ। কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর বুঝতে পারি মৃত্যু উঠে আসছে আমার জন্য। ওদের মারণরশ্মি ধেয়ে আসছে পৃথিবী থেকে শেষ মানবপ্রাণ মুছে ফেলার জন্য। আমি ভাবি চোখ বুজে ফেলবো। আমার খুন আমি মেনে নেবো না। কিন্তু বড়ো দেরি হয়ে গেছে যে! আত্মহত্যার কোনো উপায়ও আমি নিজের জন্য তৈরি রাখিনি। অসহায়ভাবে দেখা ছাড়া আমার কোনো উপায় নেই। আমিই পৃথিবীর ইতিহাসে বোধহয় একমাত্র মানুষ যে নিজের মৃত্যুর ধারাবিবরণী লিখে যাচ্ছে। হঠাৎ এ কী! অদ্ভুত একটা আলোর রশ্মি আমার দিকে এগিয়ে আসছে। আমি অপেক্ষা করতে থাকলাম। এ কী! আমার আশেপাশের পাথরগুলো জীবন্ত হয়ে উঠলো নাকি? ওদের মধ্যে যেন ছোটাছুটি পড়ে গেল। পাথরগুলো থেকেও তীরের মত আলোকবর্শা ছুটে গেল ওই মারণরশ্মির দিকে। তারপর তলোয়ারের মত তারা নিজেদের মধ্যে কাটাকুটি খেলতে লাগল। ঠিক যেমন শৈশবে টিভিতে রামায়ণ-মহাভারতের যুদ্ধে দেখেছিলাম। মাটিতে পড়ে থাকা অজস্র ধূলিকণা যেন সহসা চঞ্চল হয়ে উঠল। ধুলোর ঝড়ে চারপাশ ঢেকে দিল তারা।

আমি কি বেঁচে গেলাম তবে? বুঝতে পারলাম, খেলা ঘুরছে। পৃথিবীতে একজনকে বলীয়ান হয়ে উঠতে হয় সর্বদাই অপরজনের বিসর্জনের মাধ্যমে। একপক্ষকে মার না দিলে অপরপক্ষের ক্ষমতা হয়না। বুঝতে পারলাম, আমাকে আর কেউ ধর্তব্যে আনবে না। ম্যামথের যুদ্ধে কেই বা ছাগলছানাকে আমল দেয়! গাছেরা এখন এই পৃথিবীর শাসক। আর তাদের শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াচ্ছে মাটি।

Facebook Comments

Hits: 898

Related posts

8 Thoughts to “পৃথিবীর শেষ লেখা”

  1. অত্রি ভট্টাচার্য্য

    অদ্রীশ বর্ধন হোক বা এইচ জি ওয়েলস, আসিমভ হোক বা জুল ভের্ন – এমন অসাধারণ কল্পবিজ্ঞান লিখে যে কেউ গর্ববোধ করতেন। ছোটবেলা থেকে সাই ফাই পড়ছি। বরাবর দেখে আসছি, সামাজিক বার্তা বা ভবিষ্যদ্বাণীকেন্দ্রিক হলে গল্পের আত্মা তথা স্বাভাবিক চলন চূড়ান্তভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই প্রথম ব্যাতিক্রম পেলাম। যে লাইনে তুমি ভেবেছ, প্লট সাজিয়েছ আর তারপর নমেনক্লেচার আর প্রাসঙ্গিক ইতিহাসভূগোলে অসাধারণ যত্ন ও পারফেকশানসহ পরিবেশন করেছ – তা যে কোন পাঠককে টেনে রাখবে। শুধু এটাই বলার, একদম শেষে এসে গতিটা মারাত্মক ধাক্কা খেয়েছে। কল্পবিজ্ঞান থেকে ফ্যান্টাসীতে উল্লম্ফন হয়েছে, তাও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ছাড়া। শেষটুকু ভেবে দেখতে বলব।

    1. ANIMIKH PATRA

      এইসব নমস্য লেখকের নাম না করাই ভালো। কল্পবিজ্ঞান থেকে ফ্যান্টাসিতে উল্লম্ফন কিনা জানিনা, অন্তত সচেতনভাবে জানিনা। যেভাবে কল্পনা করতে করতে যাচ্ছিলাম, সেভাবেই শেষটাও এসেছে। তবে, অনেকে বলেছেন এটাকে বড়ো আকারে একটা নভেলা’র রূপ দেওয়া যেতো। সেক্ষেত্রে, গতি নিয়ে অভিযোগটা মেনে নিলাম। ভেবেচিন্তে জানালি বলে অনেক ধন্যবাদ জানিস। 🙂

  2. Tanushree Malik.

    বাঃ। ওরে বাব্বা। অনন্যতা য় মোড়া। ভালো লাগার মাঝে ভাবনার রসদ। great work..

    1. Animikh Patra

      অনেক ধন্যবাদ 🙂

  3. Subinita Giri

    ভয়ানক ।ভাবায়। কিছু গাছের মাথায় ছাতার মতো -idea টা ভালো লেগেছে ।গাছেদের laboratory ব্যাপারটা কেমন যখন তারা অচল! পড়তে খুব ভাল লেগেছে ।এরকম আরো অনেক লেখা পড়তে চাই ।

    1. Animikh Patra

      ভালো লেগেছে জেনে ভালো লাগছে। তবে, আর কি এমন পারবো?

  4. Shuvroneel Sagar

    অনিমিখ পাত্রকে দুর্দান্ত কবি হিসেবে জানি। সত্যি বলতে, আমি একটা সেট মেনু-সাইফাই পড়ার টিপিক্যাল প্রত্যাশা নিয়ে এসেছিলাম। কিছুদূর পড়তে গিয়ে মনে হলো, গল্প পড়ছি না বিজ্ঞান বিষয়ক গদ্য? অর্ধেক পড়ার পর ভাবলাম, ইন্টারভ্যালের পরে নিশ্চিত ছড়াবে! গল্প সাইফাই হলেও আমি কেন জানি থ্রিলারের অনুভূতি নিয়ে পড়ছিলাম। চাইছিলাম, প্রিয় অনিমিখ পাত্র যেনো শেষে বাজে গল্পকার হিসেবে না প্রমাণ হন। শেষমেশ, হতাশ করেননি। আউট অব দ্য বক্স। গল্প বলার ধরণ এমন যে মনে হবে আমাকেই বলছে আর ভীষণ ভয় ধরানো! যারা পরিবেশ, ক্লাইমেট চেইঞ্জ, গ্লোবাল ওয়ার্মিং প্রভৃতি বিষয়গুলো নিয়ে এক্টু-আধটু খোঁজখবর রাখেন তারা জানেন, এই গল্পটি কল্পকাহিনি নয়, এমনটা সত্যিই ঘটতে যাচ্ছে। সেই নিকট ভবিষ্যতের বাস্তবতাকে এতো দারুণভাবে গল্পে ধরেছেন গল্পকার, তার জন্য ভালোবাসা!

    1. Animikh Patra

      থাঙ্কিউ শুভ্রনীল। বিজ্ঞান বিষয়ক গদ্য মনে হচ্ছিল কি মাঝের ওই যন্ত্রপাতি বিষয়ক ইনফর্মেশনগুলির জন্য?

Leave a Comment