অনিমিখ পাত্র

তোমার স্বদেশে আমি গাছ রেখে দেখি

এমন একটা সময় হয়তো খুব তাড়াতাড়িই আসবে যখন নভেম্বর বলে, বস্তুত, আর কিছু থাকবে না। বর্ষার পরিবেশ সরাসরি ঝাঁপ দেবে শীতে। চিড়িয়াখানায় গিয়ে বাঘ দেখার মতোই হেমন্তকাল পড়ে থাকবে পুরনো মানুষের স্মৃতিতে, লেখাপত্রে আর বাংলা অভিধানে। যেকোনো মহার্ঘ্য জিনিসের প্রস্তুতিটি বোধহয় আরও বেশি মনোলোভা। পুজোর চারদিনের চেয়ে দীর্ঘসময় পুজো আসবার অপেক্ষাকাল যেমন। তেমনি, আমাদের এই গ্রীষ্মপ্রধান দেশে, রূপকথার শীতঋতু এসে পড়বার আগে প্রসাধনপর্ব হলো ওই নভেম্বর।
ছোটোবেলায় পুকুর-ডোবা ও তার সংলগ্ন অঞ্চল ছিল আমার এক বড় বিনোদনের জায়গা। পুকুরের একটা আলাদা ও অদ্ভুত জীবন আছে। আমার বিশ্বাস জীবনদর্শনও আছে। আমি লক্ষ্য করেছি, এই সময় জলের রঙ যেন ঈষৎ পালটে যায়। ঈষৎ গাঢ় হয়ে আসে। যেন তন্দ্রাচ্ছন্ন কিশোরের গায়ে চাদর ঢেকে দিচ্ছে তার মা। তারপর একদিন এই কিশোরটি ঠিক বড়ো হয়ে যায়। এই অনেক আমগাছের দেশে, তালগাছপ্রধান পথে পথে, কাহিনির লাবণ্য আর কইমাছ নিয়ে যে বেড়ে উঠলো সে সম্ভবত তার সারা বাকি জীবনটা একটা ফেরা-না-ফেরার টান বয়ে বেড়াতে থাকবে। তার মস্তিষ্কের স্মৃতিকুঠুরিটি বরাবরের জন্য হয়ে থাকবে ছায়াচ্ছন্ন ও গোলমেলে একটা অঞ্চল । সে সেই চাদরের ওম্‌ কে খুঁজে বেড়াবে অচেতনে-অবচেতনে। তারপর একদিন ধরে নেবে শিল্পের হাত। এই গল্প হয়তো কমবেশি সবারই। অন্তত যার শৈশব-কৈশোরে এপিকমাপের কোনো দুর্ঘটনা নেই।
কবিতা লেখা একজন কবির জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে, কিন্তু কবিতা কি তাকে যথেষ্ট নিরাপত্তা দেয় নাকি হয়ে ওঠে মায়ের মতো মুশকিল আসানকারিণী? আমি মাঝেমধ্যে এই প্রশ্ন ও উত্তরসমূহকে ওজন করে করে দেখি। আমার কেবলই যেন মনে হতে থাকে, শিল্প এক আন্তরিক সন্ত্রাসের লিপি। আমার লেখা আর আমার জীবন- এই দু’জনকে একবিছানায় শুয়ে পড়তে দেখি। আর এমনসময় আমাকে কিছুটা উদ্ধার করেন স্বদেশ সেন।

কোনো কোনো প্রিয় কবির লেখা পড়ে মনে হয়, আহা, আমি যদি এমনটা লিখতে পারতাম! কিন্তু, এই ব্যাপারটা অদ্ভুত ঠেকে যে, ‘স্বদেশ সেনের স্বদেশ’ কিংবা পরিবর্ধিত আকারে সদ্যপ্রকাশিত কাব্যসঙ্কলন ‘আপেল ঘুমিয়ে আছে’ পড়তে গিয়ে আমার কখনো এরকম মনে হয়নি। স্বদেশের এক নিবিড় ও ঘনিষ্ঠ পাঠক হয়ে উঠতে পারাই যথেষ্ট এক যোগ্যতা বলে মনে হয়েছে আমার। খানিকটা যেন একই জীবন ভাগ করে নেওয়া চলে এই কবির সঙ্গে। আমার জীবন যদি একটা রাস্তা হয়, তিনি যেন তার খানিকটা আগে আগে হেঁটে গিয়েছেন। স্বদেশ সেনের কবিতা ওই নভেম্বরের মতো। মায়াময় ও দুষ্প্রাপ্য। তার কাছে পাওয়া যায় শুশ্রুষার অনেকটা চাদর।

 
          দুধের কাপ হাতে পেয়ে নীরবে ধুয়ে নীরবে তুলে রাখা
                            সেও কম কথা নয়
                                     ( তবু কোথাও ছেলেমানুষি )

বারবার আমাদের আস্বস্ত করেন স্বদেশ সেন। আমাদের জীবনের সঙ্গে, ভালোবাসার সঙ্গে, আরো একটু করে গেঁথে দেন। খুব শান্ত একটা স্বর তার। তার আবেগে কোথাও অস্থিরতা নেই। এমনকি বিরহের কথাতেও নেই কোনো আছাড়িপিছাড়ি। যেন গোটা একটা জীবন পার করে এসে তার কথাগুলো। হৃদয়বলয়ে যা গেঁথে যায় তা তীর নয়, বুলেটের শার্পনেল নয়, বরং এক মৃদু নাছোড়বান্দা সম্মোহন।

 
       তুমি আমাকে দধির অগ্রে রাখলে না
       করলে না ঘোলের শেষ
       তুমি আমাকে
       জানালে না কিছু
                    ( দধির অগ্র )

সেইভাবে ‘প্রেমের কবিতা’ ট্যাগ নিয়ে কোনো কবিতা নেই। কিন্তু অনেক কবিতারই গায়ের ওপর মৃদু তার দু-একটা রোঁয়া। উল্লেখ থেকে উল্লেখান্তরে যেতে যেতে হয়তো বা ঈষৎ চাপা কোনো অভিমান ‘ধামাচাপা ছুটি’র মতো খাড়া হয়ে যায়। অশ্রুনদীর সুদূর পার থেকে আসা সামান্য আবেগ যা থেকে তিনি ক্রমশই ম্যাক্রোকজমের দিকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিতে থাকেন।

 
     বুঝতে পারিনা তোমাকে নিয়ে আমি কিভাবে গুরুত্ব দেবো
     কতখানি আমার হাত তুমি ধ’রেছিলে কখনো সন্ধ্যাবেলা     
                                             ( তুমি যোগ করেছো )

‘মাটিতে দুধের কাপ’ কাব্যগ্রন্থের এই কবিতায় এরপর তিনটি স্তবক জুড়ে অন্য অন্য বিচিত্রে ঘুরেফিরে শেষ স্তবকে তিনি আবার যখন হৃদয়োল্লেখের কাছে আসেন, তখন কীরকম অদ্ভুত হয়ে গেছেন তিনি। চিরাচরিত অভ্যেসের থেকে কতো দূরে, অথচ চিরাচরিত মায়ার কতো কাছে! ছিঁচকাঁদুনে কান্না নয়, অক্ষিকোটরের অনেক ভেতরে তার অশ্রু। এর সঙ্গে যদি যোগ করি এই কবি ও কবিতার আক্ষরিক সময়কাল, তাহলে তো চোখের আর পলক পড়ে না!

          
        আজ আমার ভিন্ন হৃদয় শত শত হৃদয়ের থেকে ভিন্ন
        দিনের আলোয় সিঁদুর পড়েছে মাটিতে আর আমি চিনতে পারছি না

হ্যাঁ, ‘তার কবিতা’ না বলে আমি ‘তিনি’ই বললাম, কারণ স্বদেশ সেনের কবিতা থেকে স্বদেশ সেনকে দেখতে পাওয়া যায়। এ জিনিষ বানানো যায় বলে আমি বিশ্বাস করি না।

আমি এক ছোটোমাপের মানুষ। ছোটো ছোটো মানুষ আমরা সব। অনেকরকম ভাবি। ভাবনায় ভাবনায় যেন আরেকটা সমান্তরাল পৃথিবী গড়ে উঠতে চায়। আমাদের জীবনের সীমারেখা বড়ো হয়ে যায় যেন। এক মন থেকে যেন অন্য মনে পা ফেলা যায়। কমবেশি নার্সিসিস্ট আমাদের এই এক সান্ত্বনাও বটে। নইলে তো মর-অস্তিত্বলোপের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের অর্থ-কীর্তি-স্বচ্ছলতা সমস্তই গেল ! এরকম ভাবতে ভয় হয়। স্বদেশ খুব সুস্মিতভাবে আমাদের জানিয়ে দেন, সাধারণ হয়ে বেঁচে থাকাই বা কী এমন কম অসাধারণ !

         
           যে হাওয়ায় চরাচরের ধুলো আর পট্টবাস উড়ে যায়
                           সেই হাওয়ায় কি কোথাও কিছু কম?

           কত হাজার স্মৃতি মাথায় যারা বুড়ো হয়ে যায়
           তাদের একা একা মরে যাওয়াও কম কথা নয়
                                            ( তবু কোথাও ছেলেমানুষি )

সর্বোপরি কী অসীম মঙ্গলকামনা ! মঙ্গলকামনা ! মঙ্গলকামনা ! কবির অন্তরটিকে যেন অ্যাকোয়ারিয়ামের মত দেখতে পাওয়া যাচ্ছে! কোথাও কোনো কটু ধোঁয়াকার্বন সেখানে নেই। এত অন্যরকমভাবে বলছেন কথাগুলো, এত ওলটপালট সিনট্যাক্সে বসাচ্ছেন বাক্যমালাকে, অথচ কোথাও অতিরিক্ত স্মার্ট দেখানোর প্রবণতা নেই। চেষ্টা আছে। চালাকি নেই। কারণ তার অন্তরের মানবপ্রকৃতি থেকে কক্ষণো একচুলও সরেননি তিনি। হয়তো কমিউনিস্ট দীক্ষা তাকে দিশা দিয়ে থাকবে। অনুশাসনের থেকেও, কমিউনিজমের সারটি যে মানুষকে ভালোবাসা –এটা তার মর্মে হয়তো গেঁথে গিয়েছিল। আমাদের এই অসার সময়ে তার মতো কমিউনিস্ট দীক্ষার মানুষ বড় প্রয়োজন। যেমন পড়ি উজ্জ্বল শান্ত ভবিষ্যৎ দিনের স্বপ্নবিভোর এই ম্যানিফেস্টোঃ

 
     একদিন খুব ধোয়া-কাচা সাদা শার্ট উড়বে চারদিকে
     অনেকদিনের গোটা লেবু স্বতঃই পেকে উঠবে
     পাড়ার ভেতর দেখতে দেখতে মাধবী হয়ে ছুটে যাবে কেউ।
                               ( হারানো কলম )

যে ভালোবাসতে পারে, সে আশা করতে জানে। তার কোনো বৃহৎসঞ্চারী উপকরণ দরকার লাগে না।

       
      নবীকরণের মধ্যে
      প্রোটিন পর্যায়ে
      নতুন ও অন্য ব্যবহারে
      ভরা চুলে করবীর মতো
      দেখা হবে।
      আমাদের কতো গাছে ধরেছিলো গাছের বাদাম
      দেখা হবে।
                      ( দেখা হবে,বাদাম )

এই কবি এই বিশ্ব-ভূমন্ডলের প্রাণপ্রবাহটিকে ছুঁয়ে রয়েছেন। অসীমের ধারণা তার আছে। তাই মাটির পৃথিবীর ধুলো তার এত নিবিড় আত্মীয়। আমরা তো এই বিশ্বপাঠের শিক্ষার্থীসকল।

 
    নতুন জিভের মতো অল্পলাল ভাষাটা আমায় দাও
    আমাকে দেখাও পাথরের পৃথিবীতে জ্বলছে নিভছে আলো
    দূরে – অন্ধকারে জল – তার প্রবাহ আমাকে দেখাও।
    চলে যায় সুখের রেখা তার টানা শব্দ কোন আকাশে যায়
    কেন সুন্দর কেন সুন্দর এত একটি মুনিয়া তার শাদা ডিম।
                                     ( সরোদ )

ভাষা কতো জীবন্ত, স্পন্দ্যমান এই কবিতা পড়ে আরেকবার মনে পড়ে যায়। ভাষার কাছে হাত পেতে আছেন এই কবি। তিনি শিখছেন। ভাষাও কি প্রকারান্তরে শিখছে না কিছু ? ‘পাথরের পৃথিবীতে জ্বলছে নিভছে আলো’ কিংবা ‘অন্ধকারে জল- তার প্রবাহ আমাকে দেখাও’ – এই অনুষঙ্গ এক অনন্তের দিকে রহস্য ইঙ্গিত করে। তৃতীয় লাইনে আরেক স্তর উঠে সে আরো মহাজাগতিকতার দিকে যায়। মর-মানুষের সুখের রেখাগুলো, কাহিনিগুলো যেন বা ইথারে যাত্রা করে। মহাসময়ের হার্ড-ড্রাইভে জমে উঠতে থাকে তারা। আমার চোখেমুখে আমারই মতো আরো আরো মানুষের নিশ্বাসবাষ্প এসে ভাপ দেয়। এই ম্যাক্রোকজম থেকে কবি কতো সাবলীল ও সংগতভাবে এই ধুলোমাটির পৃথিবীতে ভাবনাকে ফিরিয়ে আনেন। ‘একটি মুনিয়া তার শাদা ডিম’ যে কী অসাধারণ একটি ঘটনা, সংবেদি চোখ তার খবর এনে দেয়। এই মাইক্রোকজমিক ব্যাপারটি যে মহাসময়েরই মহাজগতেরই প্রবাহের এক অপরূপ অংশ, আমরা তা টের পেয়ে যাই। এর অব্যবহিত পরেই নতুন কেনা ট্রাইসাইক্‌লের তারের শব্দ আর ঝোপঝাড়ের কীটপতঙ্গের আওয়াজ তার কাছে সমান প্রিয় হয়ে উঠবে। অহঙ্কার কোরো না মানুষ। ওইসব কীটপতঙ্গ, ওইসব ইতর প্রাণীরা তোমার পরিবার। এবং মানুষও তো আসলে প্রকৃতিই ! এবং ওই সংবেদি চোখ, ছোটো ছোটো জীবনের অংশীদার হয়ে উঠবার ওই সমব্যথা ! যা তার কবিকৃতির সামগ্রিক বিবর্তনযাত্রায় কখনো অন্তর্হিত হয়নি। শুধুই মানুষ, তার সম্পর্ক আর তার ভাবনাচিন্তা নয়, স্বদেশ সেনের বিস্ময় প্রায় সর্বত্র যায়। তিনি লেখেনঃ ‘ রিন রিনে লাল পিঁপড়ে খোঁজে / যা খোঁজে তাই কি শিব’। অর্থাৎ সত্য। অর্থাৎ সুন্দর। মাতৃস্তনের মতো পাকা পেপে তার স্নেহ এনে দেয় চোখেঃ ‘ জননী পেপে/ পেকে আছে অকূল ভ’রে’। এরকমও হয় নাকি দৃষ্টির প্রতিস্থাপন? হয় নাকি ‘নটে গাছে সেগুণ গাছের আগুণ’? স্বদেশ জানেন।

        
      পৌষ আগলানোর মত আগলাই
      একটা অত্যন্ত ভাস্কর নামকে
      আগলে আছি নিমের দুঃখ আর তেতোর মুখ
      ধন্য ধন্য বাতাসের চারকোণায় চারটে শিশির
      ধন্য বল ভাতের ওপরে নুন
      কোনদিন ফুরবেনা ভাতের জন্য নুনের কাজ
                             ( অত্যন্ত ভাস্কর )

কত স্বল্প আয়োজনে স্বদেশ সেনের সুখ-দুঃখ ধরা পড়ে যায় ! তবু এই অপার সিন্ধুসমান মমত্ববোধের চাদর খানিকটা আলগোছে তুলে ধরলে যে জিনিসটা সর্বপ্রথম পাঠকমনে লাগে, সেটা স্বদেশের অমসৃণতা। আমাদের এই বাংলা ভাষাসমুদ্রের গভীরে স্বদেশ সেন যেন এক নীল তিমির মত। ভাষার ভেতরে অবিরাম উল্টেপাল্টে যাচ্ছেন। সমুদ্রের ভেতরেও পাক খাচ্ছে জল। কবিতাকে নিটোল ভাঁজহীন করে তুলবার দিকে তার কোনো ঝোঁক নেই যেন। চেতনায় আমূল গেঁথে দেবার মত এত তীক্ষ্ণবর্শা উচ্চারণের খনি তার কলমে থাকলেও তার গোটা এক একটা কবিতায় একটা এবড়ো খেবড়ো টলোমলো চলন থাকে। যেন তিনি একটা আলপথ দিয়ে এদিক ওদিক তাকাতে তাকাতে চলেছেন। যার ফলে তার শ্রুতিধার্য লাইনগুলি কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শেষ লাইনে আসে না। আসে মধ্য বা প্রথমের ভাগে। এই এতক্ষণ আমি যে সমস্ত পঙক্তি বা স্তবক উদ্ধৃত করলাম মূল বইতে সেগুলো খুঁজে দেখলেই এর প্রমাণ পাওয়া যাবে। অর্থাৎ গন্তব্যটাই তার কাছে একমাত্র নয়। জার্নির সৌন্দর্যও যে বিরাট একটা ব্যাপার তা স্বদেশের কবিতা পড়লে বুঝতে পারি, আর একটু চমকেও যাই। লেখার সময় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই শেষ লাইনের উচ্চতাকে এড়ানো যে ভীষণ কঠিন ! আমাদের লেখালিখি তো প্রায়শই ওই শেষলাইনের মারের দিকেই তাকিয়ে থাকে ! সেখানে, প্রায়ই স্বদেশের কবিতাশরীরে, বিশেষত প্রথম দিকের লেখায়, ঢুকে পড়ে দু-একটা আলগা লাইন। যেন সেটা না থাকলেও হত। কবিতাকে যেন আরেকটু শ্লথ করে তুলছে সে। আর আমার এই মনে হওয়াটাই কবিকে আমার আরো কাছে এনে দেয়। যেন, এই আমরা সমানবয়সী কবিবন্ধুরা যেমন আড্ডায় বসি, লেখা শোনাই একে অপরকে, মতামত দিই, তেমনি স্বদেশ সেন বাড়িয়ে ধরবেন তার লেখার খাতাটা। আর আমি বলবো, অমুক লাইনটা বাদ দিলে কেমন শোনায় ? বাস্তবিক জামশেদপুরে, স্বদেশ সেনের সান্নিধ্যে যারা ছিলেন, তাদের কারো কারো লেখায় পড়েছি নিজের লেখা সম্বন্ধে বেশ সংশয়ই ছিলো তার। তিনি অনেক প্রণম্য ও উঁচু। কিন্তু অনেক দূরের নন। সুতরাং তার এই পঙক্তি অনেকটা তো স্বগতোক্তিরই মতঃ

           
         কবিতা এখন কি যেন একটা ঘটবে
         কাঁচা ডিমে কি যেন একটা ঘটনা
                                    ( ঘটনা )

নীল তিমি কি আর জানে যে সে নীল তিমি ?

সামান্য তো ওই কটা বই। সন্ধানী পাঠকের হাতে এসে পৌঁছলো তো ঐ একটা কাব্যসঙ্কলন। তাতেই সে তো মহাগ্রন্থ ! এতবার পড়ি, তবু মহাকাশ মনে হয় তাকে। ‘পূব আর ফুরোয় না’! উপমা আর চিত্রকল্পের এই অভূতপূর্ব ধনী সম্ভার খুব বেশি কবির হাতে দেখেছি বলে মনে হয় না। এই যেমনঃ ‘নীল রবারের থাবা পড়ে গেছে এইসব আকাশের গায়ে’। এই যেমনঃ ‘ছায়ার সাবান’; ‘জাঙিয়া রঙের সূর্য’; ‘ওয়েলকামের মেয়ে’। এই যেমন তার প্রকৃতিও এমন অন্য আর অনন্যঃ

           
         পায়রা পিছলে যাবে
         এমনি হয়েছে আকাশ
         রোদ এমন
         যে কাগজে ছাপানো যায়
                         ( অস্থায়ী ) 

অথচ মজাটা এইখানে যে, স্বদেশ সেনের কবিতা কখনো কম মনোযোগ দিয়ে পড়া যায় না। তার অত্যন্ত চেনা কোনো কবিতাও আমি কখনো গড়গড় করে পড়তে পারিনি। থেমে থেমে প্রতিটা শব্দে আমাকে মন দিতে হয়েছে। অর্থাৎ তার কবিতা দুপুরের ভাতঘুমের পর এলানো কোনো সুখপাঠ কখনো নয়। আবহসঙ্গীতের মতো কোনো অপ্রাথমিক বিষয় নয়। তাতে হোঁচট আছে রীতিমতো। স্বদেশ সেনকে পড়ার জন্য প্রস্তুত তো থাকতেই হবে পাঠককে। আম-অভ্যাস থেকে আরেকটু স্নায়ুর ছিলা টানটান তো রাখতেই হবে! কারণ তিনি লিখবেন ‘একটি মুনিয়া তার শাদা ডিম’; ‘আর তার শাদা ডিম’ লিখবেন না। সময় কিংবা পরিবর্তনের অক্ষকে তিনি ধরবেন এই অসামান্যভাবেঃ

        
       অরুণা যায় থেকে অরুণা আসে
       এই সামান্য মুদ্রায়
       দিনরাত ও শরৎ হেমন্ত সব যায়
                          ( কোথায় এক পরিবর্তন )

তিনি লিখবেনঃ ‘নানা জলের এক আপন মৌরলা / আমার এক উপমার জন্য লাগে’। ‘শীতের একটা এবং-নৃত্যে’ – এবং আরো কতো কী ! এই বইয়ের শেষের ‘অগ্রন্থিত’ অংশে অনেকটাই বদলে গেছে কবির লেখা। সিনট্যাক্স আরেকটু জটিল হয়েছে। অমসৃণতা বেড়েছে। একটা বাক্যের সঙ্গে আরেকটা বাক্যের দূরত্বও বেড়েছে কিছুটা। আপাত অসংলগ্নতার ভাব এখানে বেশি। একটা উদাহরণ এমনঃ

           
          প্রণামও চিত্তসুখ হয়ে উঠবে
          প্রথম ভালোবাসাকে শুধু চোখই প্রকাশ করতে পারে
          ছিন্নভিন্ন ছবিকে ছবি করাই কবিতা
                              ( আদুর-অবোধ )

তিনি একজনের উপমা অন্যজনকে দিয়ে দিচ্ছেন। ইংরেজিতে যাকে transferred epithet বলে। সৌন্দর্য কমার বদলে হু হু করে বেড়ে যাচ্ছে। তিনি লিখছেনঃ ‘বনবিভাগের শীতে কার গাড়ি খালি গাড়ি যায়’। শীত তো আর বনবিভাগের পেটেন্ট নেওয়া নয়, আসলে তো ওই গাড়িটিই বনবিভাগের ! শ্রুতিমধুর অথচ ভাবনাজটিল এইসব লাইনগুলোঃ ‘ তোতা পড়ছে টিয়া পড়ছে সম্প্রসারিত আমগাছে / বৃষ্টি যখন বকুল-ভাব তখন বকুল ভাবের নদী’। অনেকসময়ই ক্রিয়া কম পড়ছে। যতিচিহ্ন দিচ্ছেন না। তৈরি হচ্ছে তার ‘রূপের বাহান্ন হাত ছায়া’।
স্বদেশ সেনের ছায়ায় আসতে গেলে তার সমস্ত কবিতা পড়া দরকার। তিনি আমাদের বাল্মিকী। যখন দীর্ঘদিন লিখতে পারি না কিছু, মনের ভেতর কেবল কুয়াশা আর মেঘ, তখন এই ভেবে সান্ত্বনা পাই যে, নাই বা হলো আমার লেখা, স্বদেশ সেনের কবিতা পড়েই বাকি জীবন কাটিয়ে দেওয়া যায়।

(পূর্বে প্রকাশিতঃ গ্রন্থি পত্রিকার স্বদেশল্যান্ড সংখ্যা, ২০১৫)

Facebook Comments

Hits: 415

Related posts

Leave a Comment